
রাজধানীর যানজট, সীমিত গণপরিবহন এবং প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবনে মোটরসাইকেল এখন আর কেবল শখের বাহন নয়—এটি মধ্যবিত্ত মানুষের সময় বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় এবং বহু পরিবারের আয়ের একমাত্র ভরসা। ঠিক এমন বাস্তবতায় মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি স্লোগান—“আমি অগ্রিম কর দেব না।”এটি এখন শুধু একটি প্রতিবাদী বাক্য নয়; বরং মধ্যবিত্তের চাপা ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। “বাইক বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন”চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাইড-শেয়ার চালক—সবারই একটাই বক্তব্য:বর্তমান বাস্তবতায় বাইক কোনো বিলাসপণ্য নয়।বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা মানুষের কাছে মোটরসাইকেল একটি প্রয়োজনীয় পরিবহন মাধ্যম।অফিসে সময়মতো পৌঁছানো, দ্রুত ব্যবসায়িক কাজ শেষ করা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে চলাচল—সব ক্ষেত্রেই বাইক এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।অনেকেই বলছেন, যে দেশে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন এখনও নিশ্চিত হয়নি, সেখানে বাইকের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।আয়ের উৎসে চাপ”বাংলাদেশে হাজারো তরুণ বর্তমানে রাইড-শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবার সঙ্গে যুক্ত।খাদ্য সরবরাহ, কুরিয়ার, ই-কমার্স ডেলিভারি কিংবা অ্যাপভিত্তিক যাত্রী পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেলই প্রধান বাহন।এই খাতে কাজ করা একজন রাইডার বলেন,“বাইক দিয়ে আমি পরিবার চালাই। কিস্তি দিই, সংসার চালাই। এখন যদি অগ্রিম কর দিতে হয়, তাহলে আমাদের মতো মানুষের বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে।”বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত করের চাপ সরাসরি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর পড়বে। কারণ যারা বিলাসিতার জন্য নয়, বরং জীবিকার তাগিদে বাইক ব্যবহার করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।কর ব্যবস্থায় বৈষম্যের অভিযোগ সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, দেশে এখনো অনেক বড় খাতে কর ফাঁকি ও অনিয়ম বিদ্যমান। অথচ সহজে শনাক্তযোগ্য মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপরই নতুন করের বোঝা চাপানো হচ্ছে।তাদের প্রশ্ন—যেখানে নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, সেখানে আবার কেন অগ্রিম কর?অনেকে এটিকে “রাজস্ব আদায়ের সহজ পথ” হিসেবে দেখছেন, যেখানে প্রকৃত সংস্কারের বদলে সাধারণ মানুষের পকেটে হাত দেওয়া হচ্ছে।সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়, ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইতোমধ্যে “অগ্রিম কর প্রত্যাহার চাই” দাবিতে নানা পোস্ট, ভিডিও এবং প্রতিবাদী লেখা ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণদের বড় একটি অংশ বলছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে বাইক ব্যবহারকারীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবেঅনেকেই লিখছেন:“বাইক আমার শখ নয়, প্রয়োজন।” “মধ্যবিত্তকে বাঁচতে দিন।“অগ্রিম কর নয়, সাশ্রয়ী পরিবহন চাই।”বিশেষজ্ঞদের মত অর্থনীতি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, করনীতি হতে হবে বাস্তবমুখী ও আয়ভিত্তিক।এমন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত নয় যা সরাসরি কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।তাদের মতে, মোটরসাইকেল খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে শুধু ব্যবহারকারীরাই নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যবসা, সার্ভিস সেক্টর এবং ডিজিটাল ডেলিভারি অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।শেষ কথা বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মোটরসাইকেল আর বিলাসিতার প্রতীক নয়।এটি সময়ের প্রয়োজন, জীবিকার মাধ্যম এবং অনেকের জন্য স্বাধীন চলাচলের একমাত্র উপায়।তাই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই—রাষ্ট্র কি জনগণের বাস্তবতা বুঝবে, নাকি নতুন করের বোঝা চাপিয়ে মধ্যবিত্তের জীবন আরও কঠিন করে তুলবে?”আমি অগ্রিম কর দেব না”—এই স্লোগান তাই কেবল করবিরোধী অবস্থান নয়; এটি সাধারণ মানুষের বাঁচার লড়াইয়ের ভাষা হয়ে উঠছে।
শাহবাজ খান
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী