জাতীয়রাজনীতিরুপসী বাংলালাইফস্টাইলস্বাস্থ্যপাতা

কেনাকাটায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত, সামাজিক দূরত্বের বালাই ছিলো না মোটেও

এসকে জামান  : গরমে অনেকেই মাস্ক রাখছেন না মুখে। শিশুদের মুখেও মাস্ক কম দেখা গেছে। প্রতিটি দোকানেই প্রবেশ করতে হচ্ছে ভিড় ঠেলে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্বের বালাই ছিলো না

ঈদের বাকি আর কয়েকদিন। দিন ঘনিয়ে আসায় রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে বেড়েছে ক্রেতার আনাগোনা, বেড়ছে বেচাকেনাও। বেচাকেনা যে হারে বেড়েছে ঠিক তার উল্টোভাবে কমেছে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা। এতে বাড়ছে ঝুঁকি, বিশেষ করে ঝুঁকি বাড়ছে নারী ও শিশুদের।

গতকাল রোববার রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় দেখা গেছে, অনেক ক্রেতাই তাদের পরিবার বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে হাজির হয়েছেন। কেউ কোলে করে তো কেউ আবার হাঁটিয়ে নিয়ে ঘুরছেন এক দোকান থেকে আরেক দোকান। গরমে অনেকেই মাস্ক রাখছেন না মুখে। শিশুদের মুখেও মাস্ক দেখা গেছে কম। প্রায় প্রতিটি দোকানেই প্রবেশ করতে হচ্ছে ভিড় ঠেলে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে সামাজিক যে দূরত্বের কথা বলা হয়, তার বালাই ছিলো না।

দুপুরের পর কথা হয় নিউমার্কেটের বিক্রেতা আলী হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, অনেক দিন বন্ধ থাকার পর দোকান খুলতে পেরেছেন। বেচাবিক্রি শুরু হলে খুশি তিনি। কাস্টমারের মুখে মাস্ক না থাকলে বলতেও পারি না যে, দোকানে আইসেন না। আবার কাপড় বিক্রিও তো করতে হবে। তবে দোকানে ঢোকার পর মাস্ক পরতে বলি। দোকানে কয়েক প্যাকেট মাস্ক রাখা আছে। অনেক সময় নিজের দোকান থেকেও মাস্ক দিই কাস্টমারকে। কিন্তু দোকানে কেনাকাটার সময় ভিড় হলে সামাজিক দূরত্ব মানানো কঠিন বলে জানান তিনি। চলমান লকডাউনের মধ্যেও ব্যবসায়ীদের লোকসানের কথা বিবেচনা করে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ঢাকার দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুলে দিয়েছে সরকার। কিন্তু তখনও বন্ধ ছিল গণপরিবহন, তাই ক্রেতা ছিলো কম। ৬ মে থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়া অন্য গণপরিবহন চলাচল শুরু হলে দোকানে বেড়ে যায় ক্রেতার ভিড়, বাড়ে কেনাকাটা। যদিও করোনার মধ্যেই শর্ত সাপেক্ষে মার্কেট ও শপিং মল খুলে দেয়া হয়েছে। মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দোকানদারি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। ভিড়ের কারণে সামাজিক দূরত্ব তো মানা সম্ভব নয়, মাস্কের ক্ষেত্রেও নানা অজুহাত ক্রেতা-বিক্রেতাদের। অনেকের মাস্ক থাকলেও তা যেন ঠাঁই নিয়েছে শরীরের নানা জায়গায়। কারো মাস্ক নাকের নিচে, কারোটা আরও নিচে নেমে থুতনিতে ঠাঁই নিয়েছে। অনেকে পকেটে রেখেছেন, কেউবা গলায় ঝুলিয়ে। নারীদের মাস্কের পরিবর্তে নেকাব ব্যবহার করতেও দেখা গেছে। শিশুদের মুখে মাস্ক ছিলো সবচেয়ে কম। এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সচেতনতাও ছিলো কম।

সূত্রাপুর থেকে নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা একজনের কোলে মেয়ে, সঙ্গে স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রীর মুখে মাস্ক থাকলেও কোলের শিশুর মুখে ছিলো না। নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে তিনি বলেন, এই রোদে নিজেই তো মাস্ক রাখতে পারি না। ছোট বাচ্চা কী করে রাখবে। ওর মায়ের ব্যাগে মাস্ক আছে, কিন্তু পরতে চায় না। শুধু নিউমার্কেটই নয়, স্বাস্থ্যবিধি ও মাস্ক নিয়ে অবহেলা রয়েছে বড় বড় শো রুমেও। গত বৃহস্পতিবার আড়ংয়ের আসাদগেট শাখায় ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ক্রেতা প্রবেশ করা, ক্রেতা ও শিশুর মুখে মাস্ক না থাকায় এক লাখ টাকা জরিমানা করে ঢাকা উত্তর সিটির ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাস্ক ছাড়া আউটলেটে প্রবেশে নিষেধ করা হলেও শিশুদের মাস্ক ছাড়াই প্রবেশ করতে দিয়েছিলেন সেখানকার কর্মীরা। অভিযান চলার সময় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানা দোকানির দায়িত্ব। আমাদের ভারতের পরিস্থিতি দেখেও শিক্ষা নিতে হবে। ক্রেতারা মাস্ক না পরলে নিজেদের ক্ষতি। অনেক শিশুর মুখে মাস্ক নেই। আমাকে ফাঁকি দিতে পারবেন, করোনাকে নয়। স্বাস্থবিধি না মেনে কোনো দোকান খোলা থাকবে না। একই অবস্থা ছিলো মোহাম্মদপুরের টোকিও স্কয়ারে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বেশ কয়েকটি দোকান ও ক্রেতাকে জরিমানা করে। উত্তর সিটির ভ্রাম্যমাণ আদালত শুক্রবার ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে ৪৮টি মামলাও করেছে। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ৪ মে চায়না টাউন মার্কেট বন্ধ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। তবে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন মনে করেন দোকান খোলার সময়ের হেরফেরের কারণেই স্বাস্থ্যবিধি মানা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে মার্কেটে ক্রেতা বেড়েছে। ক্রেতা অনুপাতে দোকান খোলার সময় কম। মানুষ সাধারণত দুপুরের পর থেকে কেনাকাটা করতে আসে। আর মূল কেনাকাটার সময় হলো সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। এখন রাত আটটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা যাচ্ছে। কিন্তু ৬টার পর দুই ঘণ্টা কোনো কাজে আসছে না। এখন বাইরে তাদের ইফতারের ব্যবস্থাও নেই। মানুষ ইফতারির আগেই বাসায় চলে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর কেউ বাজারে আসছে না। তাই আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি রাত ১২টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখার। সামাজিক দূরত্ব মানা না হলেও ক্রেতারা সবাই মুখে মাস্ক পরে আসে বলেই দাবি করেন এই নেতা। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে বলে হুঁশিয়ার করেছেন করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বিএসএমএমইউ-এর সাবেক উপাচার্য ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। না মানলে তার খেসারত দিতে হবে। শুধু মোবাইল কোর্ট করে মার্কেটগুলোতে এটা নিশ্চিত করা যাবে না। এ জন্য প্রতিটি মার্কেটে সার্বক্ষণিত টিম রাখতে হবে। বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে এসব টিম সব সময় মার্কেটে উপস্থিত থেকে কাজ করবে। নিউমার্কেটের মতো বড় জায়গায় একাধিক টিম রাখার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি জানান, সবাইকে বোঝাতে হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কেনাকাটা করতে হবে। মাস্ক অবশ্যই পরতে হবে। এটা করেত পারলে মানুষের অভ্যাস তৈরি হবে। এখন আশঙ্কার কথা হচ্ছে, আগে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষতি হতো বেশি, এখন সব বয়সীদের হচ্ছে। এটাই ঝুঁকি। কেনাকাটায় স্বাস্থ্যবিধি না মানায় করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যে ভিড় মার্কেটে দেখতে পাচ্ছি, এর মাধ্যমে সংক্রমণ বাড়বে বলে আমার ধারণা।

একটা ঈদে জামাকাপড় না কিনলে কী হয়? মার্কেট সরকার খুলেছে, যাওয়া না যাওয়া আমাদের বিষয়। অনেক নারী ও শিশু মাস্ক পরছে না। সবকিছু তো সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। লোকজন এগুলো (স্বাস্থ্যবিধি) সেভাবে মানছে, বিষয়টা তা নয়।

0Shares

Comment here