জাতীয়রকমারিরাজনীতিস্বাস্থ্যপাতা

ভীতি ও সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকা গ্রহণ করছেন

দিগন্তর ডেস্ক রিপোর্ট :গুজব উড়িয়ে দিয়ে করোনার টিকাদানকে কেন্দ্র করে সারা দেশে উৎসব বিরাজ করছে। ভীতি ও সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিকা গ্রহণ করেছেন। মন্ত্রী, সাংসদ, উচ্চ আদালতের বর্তমান ও সাবেক বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সরকারের বিভিন্নস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণটিকার উদ্বোধনী দিনে টিকা গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে এসেছে। এতে করে মানুষের মধ্যে যে ভয় ও গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল সেটি এখন অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

যারা টিকা নিয়েছেন তারাও সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উদ্বুদ্ধ করছেন। প্রথম দিন টিকাগ্রহীতা মধ্যে কয়েকজনের শরীরে মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে গুরুতর হিসেবে তেমন কিছু মনে করছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যতজন নিবন্ধন করবেন তাদের প্রত্যেককে টিকাদানের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে চলতি মাসে প্রায় ৩৫ লাখ ডোজ টিকা প্রয়োগের কথা ভাবছে সরকার।

গতকাল টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধনের পরপরই টিকা নিয়েছেন বেশ কয়েকজন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সচিব। এছাড়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ সুপ্রিম কোর্টের ৫৫ জন বিচারপতি টিকা নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান টিকা নেন। এছাড়াও রাজধানীর মহাখালী শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলামসহ সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তারা করোনা প্রতিরোধী টিকা নিয়েছেন।

মন্ত্রীদের মধ্যে প্রথমে টিকা নিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক, কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। এছাড়া জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও টিকা নিয়েছেন। সচিবদের মধ্যে টিকা নিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

টিকা গ্রহণের পর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক সবাইকে নির্ভয়ে টিকা গ্রহণের আহ্বান জানান। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হতে নিরাপদ রাখতে জনগণকে টিকা গ্রহণের আহ্বান জানান। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বীরপ্রতীক বলেন, আমি ভ্যাকসিন নিয়েছি, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। সবাইকে ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার থেকে দূরে থাকার অনুরোধ করেন। টিকা নিয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, টিকা নিয়ে অপপ্রচার করা হচ্ছে, অথচ টিকা নেয়ার ফলে তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয়নি। টিকায় কোনো ভয় নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যখন টিকার ব্যবস্থা করতে পারে নাই তখন প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে পেরেছেন, এটা অনেক বড় পাওয়া।

অপরদিকে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন টিকা নেয়ার পর বলেন, এই টিকাটি অত্যন্ত নিরাপদ। তাই, টিকা গ্রহণ বিষয়ে কোনো ধরনের আতঙ্ক বা ভয়ের কিছু নেই। গুজব ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হতে নিরাপদ থাকতে জনগণকে টিকা গ্রহণের আহ্বান জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসের টিকা নিজে নিয়ে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রথমদিন রাজধানীসহ সারা দেশের এক হাজার পাঁচটি হাসপাতালের দুই হাজার ৪০০ টিমের সদস্যরা ৩১ হাজার ১৬০ জনকে টিকাদান করেছেন। তারমধ্যে রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ৭১ জন। মোট টিকাগ্রহীতার মধ্যে নারীর প্রায় তিনগুণ বেশি পুরুষ। সংখ্যার হিসেবে ২৩ হাজার ৮৫৭ জন পুরুষ ও সাত হাজার ৩০৩ জন নারী টিকাগ্রহণ করেছেন। সরকার দেশের মোট জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ, অর্থাৎ ১৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৭ হাজার ৫০৮ জনকে করোনা ভাইরাসের টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করেছে। প্রতিজনকে দেয়া হবে দুই ডোজ টিকা। জাতীয়ভাবে কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি করা খসড়া অনুযায়ী টিকার সংরক্ষণ, বিতরণ হবে। তবে প্রয়োজনে এতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশবাসীকে টিকা নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, এটি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোনো ভয় নেই। এটা (টিকা) আপনার অধিকার। যার যেদিন সময় হবে, টিকা নিয়ে নেবেন। অনেকেই টিকা নিয়েছেন, নিচ্ছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যদি আজকে টিকা নিতেন তাহলে দেশের মানুষ আরও বেশি সাহস পেতো। তিনি বলেন, আমি মনে করি, আরও ব্যাপকভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা উচিত। আমরা যারা অবস্থাবান না, যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই, তাদের টিকা পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান জানান, গণটিকাদানের উদ্বোধনী দিনে রাজধানীসহ সারা দেশের এক হাজার ৫টি হাসপাতালের দুই হাজার চারশো বুথে ৩১ হাজার ১৬০জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। তারমধ্যে রাজধানী ঢাকায় পাঁচ হাজার ৭১ জন। মোট টিকাগ্রহীতার মধ্যে নারীর প্রায় তিনগুণ বেশি পুরুষ। সংখ্যার হিসেবে ২৩ হাজার ৮৫৭ জন পুরুষ ও সাত হাজার ৩০৩ জন নারী টিকাগ্রহণ করেছেন। তিনি জানান, প্রথমদিন টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে মাত্র ২১ জনের দেহে মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। মোট টিকাগ্রহীতার হিসেবে এটা খুবই কম। ২১জনকে গুরুত্বসহ চিকিৎসা প্রদান এবং পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছ। আজ সোমবার ফের টিকাদান শুরু হবে। এদিকে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি প্রতিদিন বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চলবে।

 

0Shares

Comment here