অর্থনীতিখেলার মাঠেজাতীয়ধর্মকর্মপ্রযুক্তি

গণধর্ষনের শিকার হাজেরা এখন ৪০ শিশুর মা

এসকে জামান : যুদ্ধের বছরে জন্ম। দারিদ্র পরিবারে খাওয়ার কষ্ট। অল্প বয়সে হারান মাকেও। বয়স তখন ৭ কী ৮ হবে হারিয়ে যান পরিবার থেকে।কখনও টোকাইদের সাথে কিংবা কখনো পকেটমারদের সাথেই দিন কাটান পথ হারানো হাজেরা।এই ছোট্ট বয়সেই মিরপুরের চিড়িয়াখানায় হোন গণধর্ষনের শিকার।

তারপর দালালের হাত ধরে চলে যান অন্ধকার আর এক জগতে।বাসায় বাসায় কাজ করা, ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেরানো কিংবা ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্রে একটু আশ্রয়ের খোঁজ কী করেননি যৌনকর্মীর কাজ থেকে বের হয়ে আসার জন্য। কিন্তু দিন শেষে ফিরে যেতে হয়েছে আবারও সেই অন্ধকার জগতে।

তবে যে লড়তে জানে, সে জিততে জানে। হাজেরা বেগম তেমনই একজন লড়াকু মানুষ।

সব বাঁধা পেরিয়ে বেরিয়ে আসেন অন্ধকার জীবন থেকে।শুধু তাই নয় কোনো যৌনকর্মীর বাচ্চাকে যেন এই অন্ধকার জগতে যেতে না হয় সেজন্য তাদের সন্তানদেরও দায়িত্ব নেন তিনি। জন্ম না দিয়েও তার ভালোবাসা মমতা দিয়ে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন ৪০ টি শিশুর হাজেরা মা।

রাজধানীর আদাবরে একটি ভাড়া বাসায় এই ৪০ সন্তানকে নিয়েই হাজেরার সংসার। এক সন্তানকে আদর করেন তো আর একজন এসে জড়িয়ে ধরে। একজনের মুখে খাবার তুলে দেন তো আর একজন মুখ হা করে বসে থাকে।

ঠিক সময় খাওয়া থেকে শুরু করে সবাইকে ঘুম পারানো সব একা হাতেই সামলান পঞ্চাশর্ধ এই নারী। এতো সন্তানের যত্ন নিতে নিতে বেশ খানিকটা হাঁপিয়ে গেলেও হাজেরা বেগমের মুখে একধরেনর তুপ্তির হাসি। এই হাসি শুধু মায়েরাই হাসতে পারেন। হাজেরা যে এই ৪০ সন্তানের মা!

তবে একজন যৌনকর্মী থেকে ৪০ সন্তানের মা হয়ে উঠার গল্পটা খুব সহজ ছিল না। কী ছিল হাজেরা থেকে হাজেরা মা হয়ে ওঠার গল্প?

হাজেরা বলেন, সমাজে সবার বাচ্চা পড়াশোনার সুযোগ পেলেও, যৌনকর্মীর বাচ্চারা পড়াশোনা করার সুযোগ পায়না। যৌনকর্মীরা মনে করে সমাজের সবচেয়ে খারাপ মানুষ তারা। তাদেরকে এই কথাটা সমাজ থেকেই মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি আমি যখন এইডস এর ক্যাম্পাইন করি তখন দেখেছি যৌনকর্মীর মেয়েরা তার মায়ের জন্য কনডম নিয়ে রাখে। এইটা দেখে আমার অনেক খারাপ লেগেছে। সেই সময় মনে হয়েছে এসব বাচ্চাদের জন্য কিছু করা দরকার। এরপর এই বাচ্চাগুলোকে নিয়ে কাজ শুরু করি।

২০০০ সালের দিকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশ-এর এইচআইভি-এইডস নিরোধ কার্যক্রমের আওতায় গঠিত হয় ঢাকার পথে থাকা যৌনকর্মীদের সংগঠন দুর্জয় নারী সংঘ। হাজেরা প্রথম কাজ শুরু করেন যৌনকর্মীদের সন্তানদের নিয়ে গঠিত দুর্জয় শিশু নিবাসে। ২০০৮ সালে নিবাসটির জন্য বিদেশি সহায়তা বন্ধ হয়ে গেলেও নিজস্ব জমানো টাকাসহ বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে প্রায় আড়াই বছর এই শিশুদের দেখভাল করতে থাকেন হাজেরা বেগম। কিছু সমস্যার কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যাঁরা দুর্জয়ের শিশুদের সহায়তা করতেন, তাঁদের সহায়তাসহ বিভিন্ন জনের সহায়তা নিয়ে হাজেরা ২০১০ সালে সাভারে ২৫টি বাচ্চা নিয়ে ‘শিশুদের জন্য আমরা’ সংগঠনটি শুরু করে। রাজধানীতে স্থানান্তরের পর এখন সন্তানের সংখ্যা ৪০।

কেউ দুধ-ডিম দেন, কেউ চাল দেন। শীতের সময় কেউ দেন কম্বল। পড়াশোনার জন্য কেউ কেউ এগিয়ে আসেন। দেশের বাইরে থাকা কয়েকজন বছরে কিছু নিয়মিত টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। কিছু পারিবারিক ট্রাস্ট, ব্যক্তি উদ্যোগের সহায়তাতেই “শিশুদের জন্য আমরা” সংগঠনটি।

এইসব বাচ্চারা কেউ স্কুলে পড়ে, কেউ কলেজে পড়ে। এই ছোট্ট বাড়িতেই হাজেরা বেগম শিশুদের জন্য সাজিয়েছেন একটি লাইব্রেরীও। হাজেরা বেগমের একটিই স্বপ্ন ঢাকার মধ্যে একটু জমির। যেখানে বাড়ি হবে, নিজেদের একটি স্কুল হবে।

হাজেরা বেগম বলেন, “আমি শুধু এই ৪০ টি বাচ্চার মা হতে চাইনা, আমি হাজারো বাচ্চার মা হতে চাই।

বুকে ছোট ছোট স্বপ্ন বুনে ৪০ সন্তানকে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন হাজেরা বেগম। কোনো প্রতিবন্ধকতায় তিনি থেমে থাকতে রাজি নন। কে ভিক্ষুকের সন্তান, কে ঠোকাইয়ের সন্তান আর কে যৌনকর্মীর সন্তান সেই ভেদাভেদ মুছে ফেলে সবাইকে এক করে গড়ে তুলতে চান একটি সুন্দর সমাজ, একটি সুন্দর দেশ।

0Shares

Comment here