জাতীয়প্রযুক্তিরকমারিরাজনীতি

বেড়েই চলছে চালের দাম, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে দুই টাকা

স্টাফ রিপোর্টার : মোটা স্বর্ণা চাল ৪২ টাকা কেজি। আটাশ ৫২ টাকা এবং মিনিকেট কেজি ৬০ টাকা কেজি বিক্রি করা হচ্ছে। আমনের উৎপাদন কম হওয়ায় এবার বাড়তি ধানের দাম। তাই চালের দামও বেশি। সরকার বাড়তি দামের লাগাম টানতে ৩৭ শতাংশ শুল্ক কমালেও তার ছিটেফোঁটা প্রভাব পড়েনি বাজারে। এভাবেই চালের বাড়তি মূল্যের কথা জানান রাজধানীর কৃষিপণ্যের পাইকারি বাজার কৃষিমার্কেটের শাপলা রাইস এজেন্সির মালিক মাঈনুদ্দীন।

পাইকারি চালের প্রতি কেজির সাথে বাজার ভেদে আরও পাঁচ থেকে সাত টাকা বেশি দামে খুচরা ব্যবসায়ীরা চাল বিক্রি করছেন রাজধানীতে। এবার আমনের ভরা মৌসুমেও গুদামে চাল মজুদ কমে অর্ধেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। হু হু করে বেড়েই যাচ্ছে চালের দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে দুই টাকা। দামের নীতিমালা না থাকায় চালের বাজারে এই নৈরাজ্য। তারপরও লোকসানের কথা বলে মিলমালিকরা দিচ্ছে না চাল। বাধ্য হয়ে সরকার মজুদ বাড়াতে বেশি করে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সাথে গত সপ্তাহে ৩৭ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছে। যাতে চালের দাম কমে। কিন্তু এর সুফল পেতে আরও প্রায় ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, গত বছর আমনের ভালোই উৎপাদন হয়েছিল। ১৫৫ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। করোনায় বিশ্বে খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করার শঙ্কা থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আহ্বান জানিয়েছেন করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য, যাতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো যায়। করোনা প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা।

এতে কৃষি মন্ত্রণালয়ও নড়েচড়ে বসে। এবার আমনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫৯ লাখ এক হাজার ৮১৫ হেক্টর বা চার কোটি ৪২ লাখ ৬৩ হাজার ৬১২ বিঘা জমি। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সম্পূর্ণ রোপা আমনের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫৪ হাজার হেক্টর বা চার লাখ আট হাজার ২২৫ বিঘা জমি। এছাড়া বোনা আমনের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার হেক্টর বা তিন লাখ ৮২ হাজার ১৮৫ বিঘা জমি। সব মিলে আমন ধানের এক লাখ পাঁচ হাজার ৩৮৮ হেক্টর জমি ক্ষতি হয়েছে। এ কারণে আমনের উৎপাদনও ২৪ লাখ টন কম হয়েছে। কারণ আমনের উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১৫৬ লাখ টনেরও বেশি। মোট উৎপাদন হয়েছে ১৩২ কোটি মে.টনের বেশি।

অপরদিকে সরকারের গুদামে খাদ্য মজুদের পরিমাণও কমতে কমতে গত মঙ্গলবার অর্ধেকের নিচে পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার টনে নেমে গেছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিলো ১০ লাখ ৬৬ হাজার টন। অপরদিকে সরকারের সাথে চুক্তি করে মিলমালিকরা দিচ্ছে না ধান, চাল। আমনে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ২৬ টাকা দরে দুই লাখ টন ধান এবং ৩৭ টাকা কেজি দরে ছয় লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং ৩৬ টাকা কেজি ৫০ হাজার টন আতপ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু গত রোববার পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার টন। ক্ষেতের পুরো ধান উঠলেও কমছে না ধানের দাম। মিলারদের কাছে চলে গেছে ধান। তারা কারসাজি করে আমনের ভরা

মৌসুমেও বাড়াচ্ছে চালের দাম। স্বয়ং কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও বলেছেন, মিলার ও আড়তদাররা নানা রকম কারসাজি করে চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশের মিলার, আড়তদার ও জোতদাররা যারা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা চালের দাম বাড়ায় এবং এবারো তারা সেই কাজ করছে। মৌসুমের সময় তারা এখনো ধান কিনছে এবং ধান ও চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই দাম কমাতে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি ভারত এবং অন্যান্য দেশ থেকে চাল আনার। ২৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা যাবে। প্রাইভেট সেক্টরকেও সেই সুযোগ দেয়া হবে। প্রাইভেট সেক্টর এবং সরকার পাঁচ-ছয় লাখ টন চাল আনতে পারবে। এর বেশি হলে আমরা আর অনুমতি দেবো না। যখনই ছয় লাখ টনের এলসি দেয়া হবে তারপর আর এলসির সুযোগ দেয়া হবে না।

চালের বাজার প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় ২৭ ডিসেম্বর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ঘোষণা দিয়েছেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানি করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে সরকার। এজন্য ২৫ শতাংশ শুল্কে বেসরকারিভাবে বৈধ ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারিভাবে চার লাখ মেট্রিক টন, জিটুজি পদ্ধতিতে দেড় লাখ মেট্রিক টন এবং বেসরকারিভাবেও চাল আমদানি করা হবে। বৈধ লাইসেন্সধারীরা আবেদন করবেন ১০ জানুয়ারির মধ্যে। বেসরকারিভাবে এই চাল আমদানি করে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেই আমরা বেসরকারিভাবে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক ছিলো, এখন কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

আমন ধান উঠলেও বাড়তি দামের ব্যাপারে জানতে চাইলে সম্প্রতি বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী এ প্রতিবেদককে জানান, দেশে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে এবার অনেক ধানের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। তাই উৎপাদন কম হওয়ায় বোরোর মতোই আমনের ভরা মৌসুমেও কমছে না ধানের দাম। সরকার এবার ১০৪০ টাকা মণ ধানের দাম নির্ধারণ করেছে। তার চেয়েও বেশি দামে ধান বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষক লাভবান হচ্ছে। তাই কমছে না চালের দাম। কারসাজির কিছু নেই। মিলমালিকরা তো ধান কিনছে না।

মাঈনুদ্দীন বলেন, সরকার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমিয়ে ২৫ শতাংশের ঘোষণা দিয়েছে। এতে কমবে চালের দাম। কিন্তু এখনই তার সুফল পাওয়া যাবে না। কারণ এলসি ওপেন করলেই চাল আসে না। বিভিন্ন ধাপ পার করতে সপ্তাহের বেশি সময় লাগবে। এ জন্য আরও প্রায় ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে ভোক্তাদের বলে জানান তিনি।

গতকাল সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানায়, এক মাসের ব্যবধানে চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৫ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ। আর এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বেড়েছে দুই টাকা। এক মাসে মোটা স্বর্ণা চালের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। কারণ ৪১ থেকে ৫০ টাকার মোটা চাল গতকাল ৪৬ থেকে ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয় বাজারে। আটাশ চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৭ শতাংশের উপরে। কারণ এক মাসের ব্যবধানে ৫০ থেকে ৫৩ টাকা কেজির চাল গতকাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয় বাজারে। আর মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। কারণ ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজির চাল গতকাল ৬০ থেকে ৬৬ টাকা কেজি বিক্রি হয় বলে টিসিবি জানায়। নীতিমালা না থাকায় হু হু করে বাড়ছে চালের দাম।

এ ব্যাপারে স্বয়ং খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘আমাদের চালের রেট বাণিজ্য, কৃষি, অর্থ, খাদ্য মন্ত্রণালয় মিলে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সহনীয় রেট কি করা যায় সেটার নীতিমালা নেই। সবকিছুর একটা নীতিমালা আছে বাট এটার নেই। তাই এখানে একটা স্ট্যান্ডার্ড রেট থাকতে হবে। সহনশীল একটি স্ট্যান্ডার্ড রেট তৈরি করতে হবে। এজন্য আমরা কমিটিও করেছি। সেটা চূড়ান্ত হলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

0Shares

Comment here