জাতীয়প্রযুক্তিরকমারিস্বাস্থ্যপাতা

২০২১ সালের নতুন সূর্য্যের সাথে উদিত হোক নতুন বিশ্ব

 

এসকে জামান : শেষ হলো বেদনাময় ২০২০। বিষাদময় বিশের শেষ সূর্যাস্তের সাথে শেষ হোক দুঃখ-বেদনা। ২০২১ সালের নতুন সূর্য্যের সাথে উদিত হোক নতুন বিশ্ব।

‘বিশেই অবসান হোক মহামারি করোনার বিষাদ, নব আনন্দ— স্পন্দন আর সুস্বাস্থ্যের এবং সৌহার্দ্যে ভরে উঠুক বিশ্বভুবন’। এমন হাজারো নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা নিয়ে গোটা বিশ্ব বরণ করছে নতুন ইংরেজি নর্ববর্ষ ২০২১ সালকে। অভিশপ্ত ২০২০ সালের সকল দুঃখ-বেদনা ভুলে নতুন বছরে অমিত সম্ভাবনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি করোনামুক্ত বিশ্ব পাওয়ার প্রত্যাশা এখন প্রতিটি প্রাণে।

গত মধ্যরাতে বিশ্বের সাথে বাংলাদেশও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নতুন আশা নিয়ে বরণ করেছে ২০২১ সালকে। করোনারকালো বিষাদের মেঘ কেটে শীতল বারিধারার মতো নতুন হর্ষ আসুক বাংলায়, সৃষ্টিকর্তার কাছে এমন প্রত্যাশা রেখে নতুন বছর উদযাপন করছে বাংলাদেশ। নতুন বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে মহাকালের আবর্তে বিলীন হতে যাচ্ছে ২০২০।

চীনের উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ক্রমেই মহামারি আকারে সংক্রমণ বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কোভিড-১৯ মহামারিতে লাখ লাখ মানুষ এরই মধ্যে মারা গেছেন। সেই সঙ্গে কয়েক কোটির বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং অর্থনৈতিক খাতে ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

১০০ কোটির বেশি শিশু করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে স্কুলে যেতে পারেনি। বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে পাঁচ লাখ ১২ হাজার ৪৯৬ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন সাত হাজার ৫৩১ জন। গত শতকেও এ ধরনের দুর্যোগে পড়েনি বিশ্ব। যার কারণে ২০২০ সাল বিশ্ববাসীর মনে দাগ কেটে থাকবে চিরকাল। প্রিয়জন হারানোর সাল হিসেবে ২০২০ নিন্দিত হবে অগণিত পরিবারে।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনার সংক্রমণ তথ্য পাওয়া যায়। পরে করোনা মোকাবিলায় মার্চের ২৬ তারিখ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ তথ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত করোনা সংক্রমণে সরকারি তথ্যে মারা গেছেন সাত হাজার ৫৫৯ জন। আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন অসংখ্য মানুষ। মহামারি করোনা ভাইরাসে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনীতিকদের পাশাপাশি খ্যাতিমান মানুষদের হারিয়েছে দেশ।

প্রথিতযশা শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের হারিয়েছে বাংলাদেশ। এত কিছুর পরে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত অনেক দেশের তুলনায় ভালো বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের জন্মশতবাষির্কী ঘিরে দেশবাসী উৎসবমুখর কর্মসূচি নেয়া হলেও বৈশ্বিক মহামারি করোনা সব কিছু থমকে দেয়, বড় ধরনের ধাক্কায় পড়ে সরকার।

উৎসবের বছর পরিণত হয় আতঙ্ক আর হতাশায়। তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আকাশচুম্বী সাফল্য কুড়িয়েছে সরকার। বিশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে সময়ে সাহসী পদক্ষেপে করোনার বড় ধাক্কা সামাল দিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে সরকার।

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেয়া বিশেষ উদ্যোগের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পেয়েছে সাধারণ মানুষ। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ এড়াতে মুজিব বর্ষের বছরব্যাপী নেয়া কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনে সরকার।

অর্থনীতি সচল রাখা এবং জনজীবন বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত বিশ্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রায় এক দশমিক ২২ লাখ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার।

করোনার প্রথম ও দ্বিতীয় ঢেউ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে অত্যন্ত সফলতার সাথে মোকাবিলা করছেন ব্লুমবার্গ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তা প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়— উপমহাদেশে বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরে এবং সমগ্র বিশ্বে করোনা মোকাবিলার দক্ষতায় বাংলাদেশ ২০তম স্থানে রয়েছে।

করোনা ধাক্কার পরও ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে মাথাপিছু আয় দুই হাজার ৬৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় ছিলো এক হাজার ৯০৯ ডলার। অর্থাৎ দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় এক বছরের ব্যবধানে ১৫৫ ডলার বেড়েছে।

২০০১৯-২০ অর্থবছরে করোনার প্রভাবে রপ্তানি ও আমদানির ক্ষেত্রের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলেও রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় এবং একাধিক দাতা সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা প্রাপ্তির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সর্বশেষ গত বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৪৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সিইবিআর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে— বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ তাদের সর্বশেষ এক রিপোর্টে এই পূর্বাভাস দেয়।

ওই রিপোর্ট অনুযায়ী আর মাত্র সাত বছর পরই চীন হবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি। ২০৩০ সালে ভারত হবে তৃতীয়। আর ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বহু ধাপ উপরে উঠে পৌঁছে যাবে ২৫ নম্বরে।

অন্যদিকে ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। নতুন ২০২১ সালে জনসাধারণের জন্য করোনার টিকা সহজলভ্য করা, অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানো, প্রবাসীদের সুরক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

অবশ্য ইতোমধ্যে করোনার টিকা বিনামূল্যে সরবরাহ করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলাসহ ক্ষুদ্র, মাঝারি, বড় শিল্পসহ সব ধরনের অর্থনৈতিক সূচক স্বাভাবিক করতেও সরকার উদ্যোগি হয়েছে।

করোনাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারি পদক্ষেপ ছিলো দৃশ্যমান। বর্তমানে দেশের ৬৮টি স্থানে করোনা ভাইরাস শনাক্তের পরীক্ষা করা হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে ঢাকায় ১০ হাজার ৫০টিসহ সারা দেশে ১৪ হাজার ৫৬৫টি আইসোলেশন শয্যা রয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের কাফন, জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করার জন্য সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ছয় সদস্যের একটি টিম গঠন করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে তিন হাজার ৬২৫ জন চিকিৎসক, এক হাজার ৩১৪ জন নার্স এবং ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের।

এছাড়া কোভিড-১৯ বিষয়ক অনলাইন প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করেছেন ১০ হাজার ৮১২ জন চিকিৎসক। কোভিড-১৯ শনাক্তের পরীক্ষা সহজ ও দ্রুত করতে পরীক্ষা কেন্দ্র বৃদ্ধির কাজ করছে সরকার।

ডাক্তার ও চিকিৎসা সেবাদানকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার পিপিই, গাউন, সু-প্রটেক্টর, অ্যাপ্রন ইত্যাদি বিতরণ করছে। পাশাপাশি, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের জন্য অ্যালকোহল, করোনা টেস্ট কিট, টেস্ট ইনস্টরুমেন্ট, জীবানুনাশক, মাস্ক, প্রটেকটিভ গিয়ারসহ মোট ১৭ ধরনের পণ্য আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির দিচ্ছে রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর।

যার কারণে বাজারে করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী সহজলভ্য। যেসকল পেশার ব্যক্তি এই সংকট মোকাবিলায় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামনে থেকে কাজ করছেন তাদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

করোনার প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে খেটেখাওয়া, হতদরিদ্র ও ভাসমান মানুষরা। এদের কথা মাথায় রেখে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নেয়। সারা দেশে নিম্ন আয়ের মানুষদের ১০ টাকা কেজি দরে ৯০ হাজার টন চাল দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশে গৃহহীন ও ভূমিহীনদের জন্য বিনামূল্যে ঘর, ছয় মাসের খাদ্য এবং নগদ অর্থ দেয়া হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি সারা দেশে বছরজুড়েই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে কর্মহীন, দুস্থ, অসহায় মানুষের সহায়তা দিয়েছে।

দুর্যোগকালীন সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা আসার পরপরই সারা দেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে মাঠে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।

করোনা সংকটে দেশব্যাপী মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ, মাইকিং, কর্মহীন ঘরবন্দি মানুষের মাঝে খাদ্য ও অর্থসহায়তা, ফ্রি টেলিহেলথ সার্ভিস, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস, করোনা রোগী বহন, করোনায় মৃত লাশের গোসল, জানাজা, দাফন ও সৎকার, দরিদ্র কৃষকের ধান কেটে মাড়াই করে ঘরে তুলে দেয়া, শিক্ষাউপকরণ বিতরণ, বৃক্ষরোপণ ও বিতরণ, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।

আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলও সাধ্য অনুযায়ী কাজ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন বছর ২০২১ উপলক্ষে দেশবাসী এবং প্রবাসী বাঙালিসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার এক বাণীতে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রকৃতির নিয়মেই যেমন নতুনের আগমনী বার্তা আমাদের উদ্বেলিত করে, তেমনি অতীত-ভবিষ্যতের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পুরনো স্মৃতি-সম্ভারে হারিয়ে যাওয়ার চিরায়ত স্বভাব কখনো আনন্দ দেয়, আর কখনো বা কৃতকর্মের শিক্ষা নব-উদ্যমে সুন্দর আগামীর পথচলার জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়।

আওয়ামী লীগ সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে ধর্মীয় উগ্রবাদসহ যেকোনো সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করারো আহ্বান জানান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা নতুন বছরে প্রতিজ্ঞা করি, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রেখে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করি। নতুন বছর ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষে-মানুষে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জোরদার করুক, সব সঙ্কট মোকাবিলার শক্তি দান করুক এবং সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি এই প্রার্থনা করি।

0Shares

Comment here