জাতীয়রাজনীতিস্বাস্থ্যপাতা

স্বাস্থ্য বিধি মানায় গড়িমসি,মাস্ক পরানোর অভিযান শিথিল

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশে শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। আগামী দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সর্বস্তরের মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’- নীতি কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে ভ্যাকসিন আসার আগ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক মাস্ক পরতে বলা হয়েছে। মাস্ক না পরে বাইরে চলাফেরা করলে শাস্তি পেতে হবে বলেও সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

শীতের শুরুতে সংক্রমণ যখন বাড়ছিল তখন জনগণকে মাস্ক পরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল কঠোর। মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে সপ্তাহখানেক পর শিথিল হয়ে যায় সেই কর্মকাণ্ড। ফলে ফের স্বাস্থ্যবিধি মানতে কিছুটা গড়িমসি শুরু করেছে মানুষ। জনবহুল স্থানে মাস্ক না পরে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে হরহামেশাই।

দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে সারা দেশে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৫ হাজারের মতো ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। পরের মাসগুলোয় পর্যায়ক্রমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার হার কমেছে। অর্থাৎ করোনার প্রকোপ যত বেড়েছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো ততই কমেছে।

তবে মাঠ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সংখ্যা আরো বাড়ানোর তাগিদ আছে। চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে যেভাবে আদালত পরিচালনা বাড়ানো হয়েছিল, তেমনিভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় কঠোর হওয়ার নির্দেশনা এসেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য গত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। এই সময়ে প্রায় পৌনে দুই লাখ মামলা হয়েছে। এসব মামলায় কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনকে, আর্থিকভাবে জরিমানা করা হয়েছে প্রায় এক লাখ ১৭০ জনকে। সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এর পরও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানানোর ক্ষেত্রে হিমশিম খাচ্ছে মাঠ প্রশাসন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে সাড়ে ৩ হাজারের মতো। মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১৫ হাজার আদালত পরিচালিত হয়েছে এপ্রিল মাসে। মে-জুন মাসে গড়ে ৯-১০ হাজার আদালত পরিচালিত হয়েছে। জুলাই-আগস্ট মাসে গড়ে ৪ থেকে ৬ হাজার এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার আদালত পরিচালিত হয়েছে।

ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এপ্রিল, মে ও জুন- এই তিন মাসে প্রচুর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। পরের কয়েক মাসে সংখ্যা কমেছে এটা ঠিক।’ তবে তিনি বলেন, ‘গত মাস (নভেম্বর) থেকে করোনা প্রতিরোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সংখ্যা অনেক বাড়ানো হয়েছে, এটা অব্যাহত থাকবে।

করোনা প্রতিরোধে সবচেয়ে বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগের ১৩টি জেলায় প্রায় সাড়ে ১১ হাজার আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এতে প্রায় ৪৫ হাজার মামলা দায়ের করে ৭৫০ জনকে কারাদণ্ড এবং ৪৫ হাজার জনকে আর্থিক দণ্ড দেয়া হয়েছে। জরিমানা বাবদ সরকারের কোষাগারে জমা হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। সবচেয়ে কম আদালত পরিচালনা করা হয়েছে চার জেলা নিয়ে গঠিত বিভাগ সিলেটে। এই বিভাগে প্রায় দুই হাজারের মতো আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার মামলায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্য সচেতনার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। মাস্ক না পরতে তারা নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। মাস্ক ছাড়াই চলছে অধিকাংশ কাজ। রাজধানীর গ্রিন রোড, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে- মাস্ক ছাড়াই অনেকে ঘোরাফেরা করছেন। কেউ কেউ মাস্ক ঝুলিয়ে রেখেছেন থুতনিতে। গণপরিবহনের শ্রমিক ও রিকশাচালকদের মধ্যে অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। শ্যামলী এলাকার রিকশাচালক মনোয়ার বলেন, মাস্ক পরে রিকশা চালাতে কষ্ট হয়। তাই পকেটে মাস্ক রেখেছেন।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, শীতের কারণে সংক্রমণ এবং মৃত্যু বেড়েছে। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি আসলে মানছে না। মাস্ক পরে না। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখে না। অথচ এই তিনটি কাজ চালিয়ে যেতে হবে করোনার টিকা না আসা পর্যন্ত। টিকা এলে সেটা কতটুকু কার্যকর হবে তা আমরা জানি না। ভ্যাকসিন দিলেই করোনা ভালো হয়ে যাবে তার তো গ্যারান্টি নেই। তবে করোনার ভ্যাকসিন এলেও ওই তিনটি কাজ নিয়মিত করতে হবে।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ওয়ালিদ হোসেন বলেন, পুলিশসহ অন্যান্য সংস্থ্যার পক্ষ থেকে মাস্ক পরানোর কার্যক্রম চলছে। অভিযানের পাশাপাশি সর্বত্রই ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’- চালুসহ অন্যান্য যে জনসচেতনতামূলক উপায় রয়েছে সেগুলোও প্রয়োগ করছি আমরা। সেই হিসেবে অভিযান চলমান আছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা আগের মতোই আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার বিষয়ে শিথিলতা দেখা যাচ্ছে। শিথিলতা যেন না থাকে সেজন্য প্রয়োজনে আমরা আরো কঠোর পদক্ষেপ নেব। তবে শুধুমাত্র আইনি ব্যবস্থা নিয়ে এটা কতটা সফল হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান। জীবন রক্ষার্থে সাধারণ মানুষকে নিজেদেরই আগে সচেতন হতে হবে।

0Shares

Comment here