অর্থনীতিজাতীয়রাজনীতি

চলেই গেলেন কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

আপেল মাহমুদ :অপুর সংসার’ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সে সংসারের যবনিকা পতন হল। দীর্ঘ দিন হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে পৃথিবীকে বিদায় জানালেন বাংলা ছবির শেষ আন্তর্জাতিক অভিনেতা কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। রবিবার বেলা ১২টা ১৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ৪০ দিনের টানা লড়াই শেষে হেরে গেলেন মৃত্যুর কাছে।

সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ১৯৫৮ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় পা রাখেন সৌমিত্র। চলচ্চিত্র অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলতে গেলে স্রষ্টা হিসাবে উঠে আসবে সত্যজিৎ রায়ের কথাই। যে মাণিক তিনি চিনেছিলেন, তা প্রায় ৬ দশক ধরে উজ্জ্বল করে রাখল বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমাকে।

আকিরা কুরোসাওয়ার যেমন তোসিরো মিফুনে, আন্দ্রে ভাইদার যেমন ভেরোদ দ্যপার্দু, ইঙ্গমার বার্গম্যানের যেমন ইনগ্রিড বার্গম্যান, সত্যজিতের তেমন সৌমিত্র। তবে ‘রেড বিয়ার্ড’ করার পর কুরোসাওয়া-মিফুনে জুটি ভেঙ্গে যায়, সত্যজিৎ-সৌমিত্র জুটি ছিল পরিচালকের শেষ দিন পর্যন্ত বহাল। ১৪টি ছবিটিতে অভিনয় সত্যজিৎ সৌমিত্রকেই বেছেছিলেন। তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বাংলার প্রথম সারির বহু পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। তপন সিনহার ‘ঝিন্দের বন্দী’, ‘আতঙ্ক’, তরুণ মজুমদারের ‘সংসার সীমান্তে’, ‘গণদেবতা’, অজয় করের ‘সাত পাকে বাঁধা, ‘পরিনীতা’, থেকে শুরু করে প্রজন্মের পর প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। যতদিন বাংলা ছবি থাকবে লোকের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে থাকবে সৌমিত্রর অভিনয় বসন্ত বিলাপ, প্রথম কদম ফুল, তিন ভুবনের পারে,মণিহার, স্ত্রী, কোনি সহ বহু ছবিতে। নতুন প্রজন্মের পরিচালক গৌতম ঘোষের ‘দেখা’,ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অসুখ’, সুমন ঘোষের পদক্ষেপ, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের হেমলক সোসাইটি, শিবপ্রসাদ-নন্দিতা রায়ের ‘বেলাশেষে’ অতনু ঘোষের ‘ ময়ুরাক্ষী’ সহ আরও বেশ কিছু ছবিতে তাঁর অভিনয়ে এ প্রজন্মের দর্শককে বিস্ময়াবিষ্ট করেছেন তিনি । সেরা অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার তিনি বেশ দেরিতেই পেয়েছেন। ‘পদক্ষেপ’ ছবিতে তিনি এই পুরস্কার পান। তবে ভারতীয় ছবির সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি ২০১২ সালে। তবে তাঁর অনেক আগেই ভারত সরকার ২০০৪ সালে পদ্মভূষণ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছে। দু বছর আগে ফরাসী সরকারের পক্ষ থেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘লিঁজিও দ্য অনার’ দেওয়া হয়। এই পুরস্কার আবার তাঁর জুটি বেঁধে দেয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে।

তবে শুধু সিনেমায় নয়, নাট্যাভিনয় ও পরিচালনাতেও ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে। যুব বয়সে নাটকে অভিনয় ছিল তাঁর অভিনয়ের প্রথম সড়ক। চলচ্চিত্রের নানা সাফল্যের পর আবার গত শতকের ৮ এর দশকে তিনি মঞ্চে ফেরত আসেন। ১৯৯৫ সালের টিকটিকি, ২০০৬ সালের হোমাপাখি এবং পরবর্তীকালে সুমন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘রাজা লিয়র’ প্রমাণ করে যে বয়স তাঁর শরীরে ছাপ ফেললেও, সৃজন দক্ষতায় ছাপ ফেলেনি।

কবি হিসাবেও সৌমিত্র তাঁর স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ‘শব্দরা আমার বাগানে’,’মধ্যরাতের সঙ্কেত’ তাঁর লেখা জনপ্রিয় কবিতা সংকলন। পত্রিকা সম্পাদক হিসাবেও তাঁর দক্ষতা মেনেছেন অনেক কবি সাহিত্যিক। ‘এক্ষণ’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন এক সময়। তাঁর অনুবাদে ব্রেখটের নাটক, বা জিব্রানের কবিতা মনজগতের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয়। অজানাকে করে আপন, ঘা মারে চিন্তা চেতনায়। প্রয়োজনে তিনি তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন অকপটে।

কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন ‘না-চলা মানেই থামা। থামা মানেই আমার কাছে মৃত্যু”। নানা শারিরীক সমস্যার মধ্যেই কাজ করছিলেন , কোভিড পরিস্থিতিতেও ঘরবন্দী রাখেন নি নিজেকে। অবশেষে থামলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় । তবে ক্ষিদদা ফাইট করেছেন বীরের মতই। আর আপামর মানব জাতিকে শিখিয়ে গেছেন সেই বীজ মন্ত্র ‘ফাইট কোনি ফাইট” ।

0Shares

Comment here