জাতীয়প্রযুক্তিরকমারিরাজনীতি

রাজধানী’র ফুটপথে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার চাঁদাবাজী

আফজাল আহমেদ : বিশ্ব মহামারী করোনা কালীন সময়ে লকডাউনের আওতায় আনা হয় গোটা রাজধানী। দীর্ঘদিন মানবেতর জীবন যাপনের পর সম্প্রতী করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে দুই সিটি কর্পোরেশনের ফুটপথে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেন প্রায় লক্ষাধিক হকার। অতি দরিদ্র, নিরিহ, অসহায় হকারদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে চলছে রমরমা চাঁদবাজি। রাজধানীর ফুটপথে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন হকার্স সংগঠনের বিরুদ্ধে।

অবৈধভাবে ফুটপথ দখল করে চাঁদাবাজির অভিযোগে অনিবন্ধিত ৭ টি হকার্স সংগঠনকে অবৈধ ঘোষনার পাশাপাশি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

অনিবন্ধিত সংগঠনগুলো হলো- “বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন” সভাপতি- আবুল হাসেম কবির, সাধারণ সম্পাদক- সেকেন্দার হায়াত, “ছিন্নমূল হকার্স সমিতি” সভাপতি- কামাল ছিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক এমরান হোসেন, “হকার্স সংগ্রাম পরিষদ” আহ্বায়ক আবুল হোসেন, “আওয়ামী হকার্স লীগ” সভাপতি- জাকারিয়া হানিফ, সাধারণ সম্পাদক- জাহিদ আলী, “ইসলামী হকার্স শ্রমিক আন্দোলন” আহ্বায়ক- আবুল কালাম জুয়েল ও যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মান্নান, “আওয়ামী হকার্স লীগ” আহ্বায়ক- লিয়াকত হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক মোয়াজ্জেম হোসেন, “হকার্স সমন্বয় পরিষদ” আহ্বায়ক- আবুল হোসেন।

২০১৭ সালের ২৩ মার্চ ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে (জেলা ও দায়রা জজ) “বাংলাদেশ হকার্স লীগ” এর সভাপতি এম.এ কাশেম ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর জমাদার ২৫, বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ কর্তৃক একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ অক্টোবর ওই আদেশ দেন ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইমাম। বাদী আদালতের রায়ের নকল কপি হাতে পান গত ৪ নভেম্বর। এই মামলায় ঢাকা বিভাগের ৪নং রাজউক এ্যাভিনিউয়ের যুগ্ম শ্রম পরিচালককেও আসামি করা হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপথে চাঁদাবাজির অভিযোগে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৭২ জনকে আসামি করে রাজধানীর ৩ টি থানায় তিনটি মামলা করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সহকারী সম্পত্তি কর্মকর্তা মুহাম্মদ সামসুল আলম। মতিঝিল থানায় ১৬ জন, পল্টন থানায় ৪৯ জন এবং শাহবাগ থানায় ৭ জনকে আসামি করে এ তিনটি মামলা করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পল্টন থানা এলাকার যে ৭টি হকার্স সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত, সেগুলোর বেশির ভাগ নেতাকর্মী এই ৩ মামলায় আসামি। “বাংলাদেশ হকার্স লীগ” এর সভাপতি এম.এ কাশেম কতৃক আদালতে করা মামলায় উল্লেখ করেন- বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৯২ ধারার বিধানমতে রেজিষ্ট্রেশন ব্যতীত কোনো ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম চালানো সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু আদালত কর্তৃক অবৈধ, নিষিদ্ধ ঘোষিত ৭ সংগঠনের নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে যাহা আদালত অবমাননার সামিল।

মামলার বাদী “বাংলাদেশ হকার্স লীগ” কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এম.এ কাশেম “দৈনিক দিগন্তর” প্রতিনিধিকে জানান, রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের ফুটপথে দেড় লাখেরও বেশি হকার ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। সরকারী নিবন্ধন ছাড়া কয়েকটি সংগঠন রাজধানীর থানা, ওয়ার্ডে কমিটি গঠন পূর্বক সেই কমিটির নেতাকর্মীদের দিয়ে অসহায় হকারকে জিম্মি করে তাদের নিকট হতে অবৈধভাবে দৈনিক ১০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করে থাকে সংগঠনগুলো। অবৈধ চাঁদাবাজির নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিলো নিবন্ধিত বৈধ হকার্স সংগঠনগুলোর ওপর। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হলেও আশানুরূপ প্রতিকার পাননি, কাজেই আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।

ডিএসসিসির সহকারী কর্মকর্তা (সম্পত্তি) জনাব সামসুল আলম সাহেবের করা মামলাগুলোয় তিনি উল্লেখ করেন, রাজপথ ও ফুটপথ দখল করে দোকান বসিয়ে সকাল আটটা থেকে রাত আট’টা-দশ’টা পর্যন্ত চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা হকাররা। এসব হকারদের নিকট হতে আসামিরা প্রতিদিন ১০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করেন। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন। এখনো এ চাঁদাবাজ চক্র ডিএসসিসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়- ঢাকায় যানজট সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ ফুটপাত দখল করে হকারদের মার্কেট করা। বিআইজিডি’র গবেষণা ফেলো জনাব শাহনেওয়াজ হোসেন “দৈনিক দিগন্তর” কে বলেন, ঢাকায় হাঁটার পথের বড় অংশ হকাররা দখল করে আছে। ফুটপথে যত্রতত্র পার্কিং এবং অবৈধভাবে ফুটপাত দখল- এটা কিন্তু যানজটের একটা বড় কারণ। ঢাকায় হকারদের মাসিকভিত্তিক এবং প্রতিদিন বিভিন্ন অংকের টাকা সংগ্রহ করে থাকে। আর এ টাকা স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি মহল। এ টাকা উত্তোলনের কাজে প্রতিটি ফুটে একজন লাইনম্যান নিয়োজিত থাকে। ফুটপথে বসা দেড় থেকে দুই লাখের মতো হকারকে যদি সুনির্দিষ্ট একটা ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায়, তা হলে মাসিক প্রায় পাঁচ কোটি টাকা আদায় হবে এবং এই টাকা দিয়ে সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সহ যানজট নিরসনে ব্যবহার করা যাবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

 

0Shares

Comment here