খেলার মাঠেজাতীয়প্রযুক্তিরাজনীতিস্বাস্থ্যপাতা

সেই বিভীষিকাময় দিন আজ, ভয়াল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

আবুল বাশার || বিকেল ৫টা ২২ মিনিট। ঠিক তখনই বিকট শব্দের বিস্ফোরণ ঘটলো। মুহুর্তেই চারপাশে বিস্ফোরণ। এক এক করে বিস্ফোরিত হলো ১৩ টি গ্রেনেড। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামেন এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। এ ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও কয়েকশত নেতাকর্মী আহত হয়েছিলেন। আজ ওই ঘটনার ১৬ বছর পূর্ণ হলেও এখনো বিচারকার্য সম্পন্ন হয়নি। ইতোমধ্যে ওই ঘটনায় দায়ের করার মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। বর্তমানে পেপারবুক সুপ্রিমকোর্টে যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে। এরপর শুনানি শেষে রায় কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকেলে ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ‘জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বিরোধী’ সমাবেশ চলছিল। আওয়ামী লীগ আয়োজিত ওই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুর থেকেই লোকে লোকারন্য সমাবেশ স্থল ও আশপাশের এলাকা। সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী মিছিল হওয়ার কথা ছিল। সে জন্য মঞ্চ নির্মাণ না করে একটি ট্রাককে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সমাবেশে সবশেষে বক্তৃতা দেন শেখ হাসিনা। বক্তৃতা শেষ করে ট্রাক থেকে নিচে নামার সিঁড়ি কাছে আসা মাত্রই বিস্ফোরণ শুরু হয়। কেঁপে উঠে পুরো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউসহ আশপাশ এলাকা। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীরা মানব দেওয়াল তৈরী করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও ঘটনাস্থলে নিহত হন ১৬ জন। এ সময় আহত আওয়ামী লীগের নারী নেত্রী আইভি রহমান ৫৮ ঘন্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে যান। এছাড়া আহত হয়ে শরীরে এক হাজারের বেশি স্প্রিন্টার নিয়ে প্রায় দেড় বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করে হেরে যান ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র ও আওয়ামী নেতা মোহাম্মদ হানিফ। শুধু আইভি ও হানিফ নয়, এ ঘটনায় সব মিলিয়ে ২৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

নিহত বাকিরা হলেন- শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুব, রফিকুল ইসলাম ওরফে আদা চাচা, রতন শিকদার, হাসিনা মমতাজ রিনা, রিজিয়া বেগম, সুফিয়া বেগম, লিটন মুনশি, আব্দুল কুদ্দুস পাটোয়ারী, আবুল কালাম আজাদ, আব্বাস উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন সরদার, আবুল কাশেম, বেলাল হোসেন, আব্দুর রহিম, আমিনুল ইসলাম মোয়াজ্জেম, জাহেদ আলী, মোতালেব হোসেন, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, মোমেন আলী, এম শামসুদ্দিন ও ইসহাক মিয়া। তারা সবাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছিলেন।

মারাত্মক আহতরা হলেন- শেখ হাসিনা, আমির হোসেন আমু, মরহুম আব্দুর রাজ্জাক, মরহুম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, মাহবুবউল আলম হানিফ, সম্প্রতি মরহুম অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবের হোসেন চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাবু, আওলাদ হোসেন, মাহবুবা পারভীন, অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, নাসিমা ফেরদৌস, শাহিদা তারেক দিপ্তী, রাশেদা আখতার রুমা, হামিদা খানম মনি, ইঞ্জিনিয়ার সেলিম, রুমা ইসলাম, কাজী মোয়াজ্জেম হোসেইন, মামুন মল্লিক প্রমুখ।

এদিকে ভয়াবহ এই গ্রেনেড হামলার ১৪ বছরের মাথায় পৃথক দুটি মামলায় গত বছরের ১০ অক্টোবর বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের মৃত্যুদন্ড দেন ঢাকার দ্রত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় আরও ১১ জনের। সাজাপ্রাপ্ত ৫১ আসামির মধ্যে এখনো পলাতক আছেন ১৮ জন। এই রায়ের বিষয়ে হাইকোর্টে আপিল মামলা শুনানীর অপেক্ষায় আছে। মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য যে পেপারবুকের প্রয়োজন ছিল তা, গত ১৬ আগস্ট বিজিপ্রেস থেকে হাইকোর্টে পৌঁছেছে।

সুপ্রিমকোর্টের মুখপত্র ও বিশেষ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুর রহমান জানান, ২১ শে আগস্টের ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় ১৩ ভলিউমে মোট ৫৮৫ টি পেপারে বুক এসেছে যা সাড়ে ১০ হাজার পৃষ্ঠা। মোট আপিল ২২ টি ও জেল আপীল ১২ টি। বর্তমানে পেপারবুক সুপ্রিমকোর্টে যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় বিচারিক আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রধান কৌসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, এ মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে সাক্ষ্য তথ্য প্রমাণে দেখেছি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার জঙ্গি গোষ্ঠীর সহায়তা নিয়ে ইতিহাসের জঘন্যতম এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যাই ছিল ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলার লক্ষ্য। যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র মানুষ এবং কোন রাজনৈতিক দলের সমাবেশে হামলার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না বলেও জানান তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারিক আদালতের রায় বিষয়ে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি উচ্চ আদালতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হবে। তিনি বলেন, মামলাটির গুরুত্ব উল্লেখ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির আবেদন করা হবে। যেন শুনানির জন্য একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়। বিচারিক আদালত আসামিদের যে সাজার রায় প্রদান করেছেন তা যেন বহাল থাকে উচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের সে প্রচেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।

আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে। এ জন্য রায় ঘোষণার পর বিচারিক আদালত মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠিয়ে দেন। যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। নথিপত্র পাওয়ার পর হাইকোর্টেও ডেথ রেফারেন্স শাখা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করে। পেপারবুক প্রস্তুত হলে মামলাটি শুনানির জন্য প্রস্তুত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়।

এদিকে, গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে আওয়ামী লীগ প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। এরই ধারাবাহিকতায় এবারও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বডুয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি জানানো হয়, বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে গ্রেনেড হামলার দিনটি স্মরণে সীমিত পরিসরে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আজ সকাল ৯টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত বেদীতে পুস্পার্ঘ্য নিবেদন করা হবে। এতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতৃবৃন্দ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং সহযোগী সংগঠনের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকগণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়াও যথাযথ স্বাস্থ্য বিধি মেনে গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ও হতাহতদের স্মরণে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করার জন্য আহবান জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের

 

 

0Shares

Comment here