জাতীয়প্রযুক্তিরকমারিস্বাস্থ্যপাতা

ফুলেফেপে উঠেছে তিস্তা, রেড এ্যালার্ট জারি

মোঃ মিজানুর রহমান
রংপুর বিভাগীয় ব্যুরো চীফ | প্রতিদিনেই হু হু করে বাড়ছে তিস্তা নদীর পানি। ভারতের গজলডোবার পানি ছেড়ে দেয়ায় এবং কয়েকদিন থেকে উজানে ভারতের পাহাড়ি ঢলের মাত্রা বেড়ে যায়। একইসঙ্গে গত কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে তিস্তা নদীর পানি প্রতিদিন বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা নদীর বাম তীরে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলার প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
তিস্তার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার রাস্তা-ঘাট ডুবে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের মানুষ গুলো।
দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো। চৌকি/খাটের উপর মাচাং বানিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পানিবন্দি পরিবারের মানুষগুলো। কেউ কেউ ঘর-বাড়ি ছেড়ে উঁচু বাঁধ বা পার্শ্ববর্তী গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন। খুব কষ্টে পড়েছেন বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও শিশুরা। গবাদি পশু-পাখি নিয়েও চরম বিপাকে পানিবন্দি পরিবারগুলো। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে বন্যা দুর্গত এলাকায়।
তিস্তার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জেগে ওঠা চরে বাদাম ও ভুট্টাসহ নানান জাতের সবজি চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করত চরাঞ্চলের মানুষ।
অনেকেই গবাদি পশু পালন ও মাছ চাষ করেও সংসারের চাকা সচল রেখেছেন।
গত এক মাস ধরে থেমে থেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চরাঞ্চলের চাষীদের উঠতি ফসলের ক্ষেত বন্যার পানিতে ডুবে যায়। ভেসে যায় শত শত পুকুরের মাছ। বিশেষ করে বাদাম ক্ষেতের অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে চলমান বন্যায়।
চরাঞ্চলের সব থেকে লাভবান ফসল বাদাম, এ বছর বন্যায় ডুবে যাওয়ায় ঘরে তুলতে পারেননি চাষীরা। কেউ কেউ পানিতে ডুবে ডুবে বাদাম সংগ্রহ করলেও তা পানি পাওয়ায় অঙ্কুরোদগম ঘটছে। ফলে চাষের খরচ তোলা নিয়েও শঙ্কায় চাষীরা। ভুট্টা ক্ষেতেও একই অবস্থা বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাতেও অঙ্কুরোদগম ঘটছে।
এসব ভিজে যাওয়া ফসল সামান্য রোদে শুকানো নিয়েও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষীরা। পরিবারের সব সদস্য মিলে ভিজা ফসল উঁচু স্থানে নিয়ে শুকানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেটাও করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চাষাবাদের খরচ উত্তোলনসহ পরিবার পরিজনের খাবার নিয়েও চিন্তিত তিস্তা পাড়ের চাষীরা।
রবিবার (১২ জুলাই) দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ৭৫ মিটার। যা (স্বাভাবিক ৫২ দশমিক ৬০ মিটার) বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, শুক্রবার দুপুর থেকে রবিবার পর্যন্ত পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার মধ্যরাতে মুহুর্তের মধ্যে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। শনিবার ও রবিবার পানি কিছুটা কমলেও বিপদসীমার ওপর দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তার বামতীরে লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। সেই সাথে তিস্তা ব্যারেজ রক্ষায় ৪৪ টি জলকপাট খুলে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ বন্যা কিছুটা সময় স্থায়ী হতে পারে বলেও জানান তিনি।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়শ্রী রানী রায় বলেন, উপজেলার কর্মকর্তাগনকে সাথে নিয়ে টীম গঠন করে প্রতিটি ইউনিয়ন মনিটরিং করা হচ্ছে।সেইসাথে এলাকার জনপ্রতিনিধিগণ তাঁদের স্ব-স্ব এলাকায় নজরদারী বৃদ্ধি করেছেন।
লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, তিস্তা নদীতে বেশী গভীরতা না থাকায় সামান্য পানি বৃদ্ধি পেলেই এ জেলায় বন্যা দেখা দেয়। তাই নদী খনন করে দুই তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রস্তাব ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। এব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্তও করেছেন। একনেকে অনুমোদন হলেই লাল মনিরহাটবাসী বন্যা থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাবে। এছাড়াও চলমান বন্যায় পানিবন্দি পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ত্রাণ সহায়তা যতটুকু প্রয়োজন আমরা সাথে সাথে তা পৌঁছে দেব। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
0Shares

Comment here