খেলার মাঠেজাতীয়ধর্মকর্ম

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দাফন করা হবে মাজেদের লাশ।

 

দিগন্তর রিপোর্টঃ  স্থানীয়দের কঠোর আপত্তি থাকায় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি আবদুল মাজেদের লাশ দাফনের ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি ভোলা জেলা প্রশাসন। তাই মাজেদের লাশ তার শশুরবাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে দাফন করা হবে।

গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকালে লালমোহন উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে বঙ্গবন্ধুর খুনি মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর তার লাশ ভোলার মাটিতে না পাঠানোর দাবি জানান ভোলা-৩ আসনের এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন।

এর আগে শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে আব্দুল মাজেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরপর রাত পৌনে একটার দিকে পুলিশ পাহারায় মাজেদের লাশ অ্যাম্বুলেন্স যোগে কারাগার থেকে বের করে তার গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বাটামারা গ্রামের উদ্দেশ্যে নেয়া হয়।

কারা অধিদফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রোববার রাত ১২টার ২০ মিনিটে পর স্ত্রী মাজেদা বেগমসহ কয়েকজন স্বজন কারাগেটে আসেন। প্রক্রিয়া শেষে মাজেদের লাশ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কারা সূত্র জানায়, এর আগে শুক্রবার বিকেলেই কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করে কারা কর্তৃপক্ষ। শেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে শনিবার দুুপুরে ফাঁসির মহড়া দেন জল্লাদরা। অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন করে সন্ধ্যার পর কারাগারের চারদিকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। রাত আটটার দিকে ফাঁসির মঞ্চের চারপাশে পাওয়ারফুল হেলোজেন লাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, বঙ্গবন্ধুর খুনি বরখাস্তকৃত ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করতে শুক্রবারই গাজীপুর থেকে ঢাকা করাগারের আনা হয় অভিজ্ঞ জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে মনির, আবুল, তরিকুল ও সোহেলসহ ১০ সদস্যের জল্লাদকে। ২০১০ সালে ২৭ জানুয়ারী রাতে বঙ্গবন্ধুর যে পাঁচ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়, সেই দায়িত্বও পালন করেন শাহজাহান।

এদিকে কারা অধিদফতর সূত্র জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যাপ্টেন মাজেদের স্ত্রী সালেহা বেগমসহ পাঁচজন স্বজন আসামি মাজেদের সঙ্গে দেখা করে গেছেন। এরপর তাদের প্রস্ততিও তারা সম্পন্ন করে রাখেন।

কারা সূত্র মতে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের অন্যতম খুনি ক্যাপ্টেন (ররখাস্ত) আব্দুল মাজেদকে গ্রেফতারের পর কেরানিগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল। সব ফাঁসি কার্যকরের সকল প্রস্তুতির পর শনিবার রাত সাড়ে ১১টার পর মাজেদকে কনডেম সেলেই তওবা করনা কারা মসজিদের ইমাম।

পরে পৌনে ১২টার দিকে অভিজ্ঞ শাহজাহান ও মনিরসহ ছয়জন জল্লাদ তাকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে আসেন। পরে খুনি মাজেদের হাত-পা বেধে ফেলা হয়। এক জল্লাদ তার মুখে যম টুপি ও আরেকজন তার গলায় ফাঁসির দড়ি পড়িয়ে দেন। রাত ঠিত ১২টা ০১ মিনিট সিনিয়র জেল সুপার মঞ্চের পাশে হাতের রুমাল ফেলে দিলে গিয়ার টেনে মাজেদের ফাঁসি কার্যকর করেন জল্লাদ শাহজাহান। তাকে সহযোগিতার করেন আরো অন্তত ছয়জন জল্লাদ। অন্তত ১০ মিনিট দড়িতে ঝুলিয়ে রাখার পর লাশ নীচে নামানো হয়। পরে কারা চিকিৎসক আসামির আসামির হাত-পায়ের রগ কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এসময় সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের জড়িত আত্মস্বীকৃত ও সর্বোচ্চ আদালতে মুত্যদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান ও মুহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসির দণ্ড ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করা হয়।

ওই রায় কার্যকরের আগেই ২০০২ সালে পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে মারা যান আরেক ঘাতক আজিজ পাশা। তবে ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চুড়ান্ত রায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকা ১২ খুনির মধ্যে এখনো পাঁচ খুনি বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছেন। তারা হলেন— খন্দকার আব্দুর রশিদ, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী, শরিফুল হক ডালিম ও মোসলেহ উদ্দিন।

গত বুধবার দুপুরে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক এম হেলাল উদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন (বরখাস্ত) আবদুল মাজেদের মৃৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। একই দিন সন্ধ্যায় মাজেদ কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি তার প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেন। এরপর থেকেই মাজেদের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিতে থাকে কারা কর্তৃপক্ষ।

এর আগে গত ৬ এপ্রিল গভীর রাতে মিরপুর সাড়ে ১১ থেকে আব্দুল মাজেদকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি বিশেষ দল। মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত এই আসামি গত ২৩ বছর ধরে ভারতে পালিয়ে ছিলেন। এর আগে লিবিয়া ও পাকিস্তানে আত্মগোপনে ছিলেন।

নব্বই দশকের মাঝামাঝি আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে খুনি আবদুল মাজেদ প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যান। কিন্তু লিবিয়া ও পাকিস্তানে সুবিধা করতে না পেরে আবারো ভারতে ফিরে আসেন। বিশ্বজুড়ে মহামারিতে রূপ নেয়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস আতঙ্কে ভারত থেকে গোপনে সীমান্ত পথে দেশে আসেন এই ঘাতক।

0Shares

Comment here