জাতীয়রকমারিরাজনীতিরুপসী বাংলা

ধুলায় দুর্বিষহ নগরজীবন, খোঁড়াখুঁড়িতেও যোগ হচ্ছে নতুন মাত্রা।

এসকে জামানঃ বিশ্বের দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় গতকাল বুধবার সকালে ৫ম অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সকাল ১০টা ২৩ মিনিটে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ঢাকার স্কোর ছিল ১৮৯, যার অর্থ এ শহরের বাতাসের মান ‘অস্বাস্থ্যকর’।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একিউআই স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে হয়, তখন শিশু, প্রাপ্তবয়স্ক এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের বাইরে তাদের কার্যক্রম সীমিত রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। মাত্রাতিরিক্ত মানুষের বসবাসের নগরী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই বাতাসে দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণ বলছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল, বিআরটি, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের নির্মাণকাজের ফলে সৃষ্ট আবর্জনা ও ধুলা বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। একইভাবে শহরের ভেতরে রাস্তা-ড্রেন খোঁড়াখুঁড়ি ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের সময়ও সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষতিকর আবর্জনা, যেগুলো সহজেই বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকায় চলমান মেগা প্রকল্পগুলোর ঠিকাদাররা পরিবেশের নিয়মকানুন কিছুই মানছেন না। তাদের বারবার তাগাদা দেয়ার পরও দূষণরোধক ব্যবস্থা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন না তারা। উল্টো জরিমানা করায় পরিবেশ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নালিশ করেছেন তারা।

উত্তরা থেকে মিরপুর-আগারগাঁও হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত চলছে ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। গত নভেম্বরে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর ও আগারগাঁওয়ে বায়ুমান সূচক পরীক্ষা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। ওই সময় মিরপুরে বায়ুমান সূচক ছিল ৭৬৪ এসপিএম ও আগারগাঁওয়ে ৮২০ এসপিএম। বায়ূদূষণের জন্য সে সময় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার পর প্রকল্প এলাকায় আরো খারাপ হয়েছে বাতাসের মান। ডিসেম্বরে মিরপুরে বায়ুমান ছিল ১১৩৭ এসপিএম, আগারগাঁওয়ে ১১১১ এসপিএম।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরো রাজধানীই এখন ধূলায় একাকার। দুর্বিসহ নগরবাসীর জীবন। গাজীপুর থেকে টঙ্গী হয়ে উত্তরা, উত্তরা থেকে বনানী, গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, মিরপুর ১ নম্বর থেকে ১০ নম্বর গোলচত্বর হয়ে আগারগাঁও। ফার্মগেইট থেকে কাওরানবাজার, বাংলামোটর-শাহবাগ-পল্টন হয়ে মতিঝিল সবখানেই শুধু ধুলা আর ধুলা। একুশের বইমেলা উপলক্ষে শাহবাগ এলাকায় অন্তত দুই বার পানি ছিটানো হচ্ছে। তবে অন্যান্য এলাকায় পানি ছিটানো হয় না বললেই চলে। অন্যদিকে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ক নির্মাণ কাজ চলছে রাজধানীর জুরাইন এলাকা থেকে একেবারে মাওয়া পর্যন্ত। ওই মহাসড়কেও শুধু ধুলা আর ধুলা। মুন্সিগঞ্জের বাসিন্দা ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, মহাসড়ক ধরে মুন্সীগঞ্জে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ে মানুষ। এমনকি গাড়ি দিয়ে চলতে গেলে গাড়ির এসিও কখনও কখনও বন্ধ হয়ে যায়। আর গাড়িতো ধুলায় চেনাই যায় না। কল্যাণপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী বলেন, বহুদিন ধরেই আমরা উন্নয়নের ধকল সহ্য করে চলেছি। ধুলার কারণে প্রায়ই মানুষই এখন শ্বাসকষ্ট রোগে আক্রান্ত। ঘনবসতি মুগদা মান্ডা এলাকার বাসিন্দারাও ধুলার কারণে অতিষ্ঠ। উত্তরায় দীর্ঘদিন ধরে চলা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে উত্তরাবাসীকে দুর্বিসহ যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে বলে জানান স্থানীয়রা।

গত সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর ১০টি স্বাস্থ্যঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে এক নম্বর ঝুঁকি হলো বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন। আর গত বছর সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা ছিল তৃতীয়। ঢাকার বায়ুদূষণের এই চিত্র সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তরের নিজেদের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে ১৯ জানুয়ারি ঢাকার বায়ুমান ছিল মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। বিশ্বের প্রায় বেশির ভাগ শহরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দূতাবাস ও কার্যালয়ে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ যন্ত্র রয়েছে। ওই যন্ত্রে শহরগুলোর বায়ুমান প্রতি ঘণ্টায় হালনাগাদ করা হয়। ওই তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের হিসাব অনুযায়ী, ১৯ ও ২০ জানুরারি বাংলাদেশ সময় রাত ১১টার দিকে বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা ছিল এক নম্বরে। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল নয়াদিল্লি। গতকাল সর্বশেষ দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল পঞ্চম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় দূষণে এবার আরেক বিপদ নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, তীব্র যানজট, মেয়াদোত্তীর্ণ মোটরযান ও শিল্পকারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ভারী ধাতু ধুলার সঙ্গে যোগ হচ্ছে। ঘরের বাইরে তো বটেই, বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠেও ভর করছে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা। এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ছে নগরবাসী, বিশেষ করে শিশুরা। শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে শরীরে বাসা বাঁধছে ক্যানসারসহ রোগবালাই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়েছে, উন্নয়ন রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলার সময় বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও পরিবহনের ক্ষেত্রে বাতাসে ধূলিকণার বিস্তার প্রতিরোধে যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। খোঁড়াখুঁড়ির পর কাদামাটি এবং সিমেন্ট, বালু, ক্ষুদ্র ইটের টুকরোর মতো বাতাসে মিশ্রণযোগ্য নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে একদিকে কাদামাটি বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে উন্মুক্ত নির্মাণসামগ্রী বাতাসে মিশে দূষণ করছে।

গত ১৩ জানুয়ারি উচ্চ আদালতের এক রিট পিটিশনে পরিবেশ দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে নয়টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থা হিসেবে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েকে রাখা হয়েছে। নির্দেশনাগুলো হলো- নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, নিয়মিত পানি ছিটানো ও নিয়মকানুন মেনে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়া। তবে গতকাল সরেজমিন মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকা ঘুরে বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখতে দেখা গেছে। উত্তরা এলাকায় পানি ছিটানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা এমনভাবে ছিটানো হয়েছে যে কোনো অংশে পানির ছোঁয়া লাগেনি, আবার কোনো কোনো জায়গায় পানি জমে কাদা হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশরাব বলেন, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ পানি ছিটিয়ে আরো দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, পানি ছিটানোর ফলে বিভিন্ন জায়গায় কাদার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই কাদার ওপর দিয়ে যখন গাড়ি চলছে, তখন তা পুরো সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেগুলো শুকিয়ে ধুলা হয়ে বাতাসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এজন্য আমরা পানি স্প্রে করার পরামর্শ দিয়ে থাকি।

মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের কাজ বাস্তবায়ন করছেন দেশী-বিদেশী স্বনামধন্য ঠিকাদাররা। এর মধ্যে মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ করছে ইথাল থাই কোম্পানী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশি ঠিকাদাররাও পরিবেশগত দিকগুলো ভালোমতো অনুসরণ না করে কাজ করছে। এতে করে পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৬) উপপ্রকল্প পরিচালক (গণসংযোগ) খান মো. মীজানুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, মেট্রোরেলের কাজ পরিবেশ আইনকানুন মেনেই বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় বাতাসের মান সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। একই ধরনের দাবি করেছেন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক এএইচএম শাখাওয়াত আকতারও। তবে ভুক্তভোগিদের অভিযোগ, নির্মাণকারী প্রকল্প পরিচালক একটু সচেতন হলে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যেতো। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নির্বাহী সহসভাপতি ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় সরকারকেই বের করতে হবে। সরকার চাইলে সবই সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বিদেশে গিয়ে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ যেভাবে দেখে আসেন দেশে সেভাবে প্রয়োগে ব্যবস্থা নেন না। ড. মতিন বলেন, এটা সিদ্ধান্তের বিষয়। সরকার সিদ্ধান্ত দিলে ঠিকাদার দেশি-বিদেশী যেই হোক না কেনো তা তারা মানতে বাধ্য।

 

 

0Shares

Comment here