অর্থনীতিজাতীয়প্রযুক্তি

খুলনায় পাটকল শ্রমিকদের দাবী আদায়ে চলছে আমরন অনশন, অসুস্থ-৭।

খুলনা খালিশপুর থেকে সন্জুঃ কেউ কথা রাখেনি”। শ্রমিকদেরও কথা রাখেনি কর্তৃপক্ষ। তাই উপায়ান্তু না পেয়ে তারা আজ রাজপথে। বিছানা-বালিশ নিয়ে দিন-রাত আমরণ অনশনে বসেছেন খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা। দাবি আদায়ে গত মঙ্গলবার বিকেল ৩টা থেকে নিজ নিজ মিলগেটের সামনের সড়কে তারা অনশন কর্মসূচি পালন করছে। শ্রমিকদের এই কর্মসূচিতে অংশ নেন তাদের পরিবারের স্বজনরাও। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ থেকে বাড়ি ফিরবে না এমন হুশিয়ারি তাদের। ফলে আন্দোলন ক্রমেই দানা বাঁধছে।

গতকাল শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি গেটের সামনে যেন ভিন্ন ভিন্ন হৃদয় বিদারক দৃশ্য। ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিকদের এ এক আন্দোলনের ভিন্ন মাত্রা। অনশনকারীদের সামনে দিয়ে চলা অনেক পথচারীদের চোখ ভিজে উঠছে। শ্রমিকদের এই করুন আর্তনাদের ঢেউ যেন আছড়ে পড়ছে খুলনা মহানগরীর সর্বত্র। শ্রমিকরা জীবন উৎসর্গ করেও আন্দোলনে অবিচল। তাদের স্বত:স্ফূর্ততা চোখে পড়ার মত। অনেক ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা তাদের অসুস্থ বাবাকে রাস্তায় রেখে ঘরে ঘুমাতে পারছেনা। যার জন্য তারাও নেমে এসেছে রাজপথে।
অনশনে অসুস্থ হওয়া ৭ শ্রমিককে গতকাল বুধবার খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অনশনে থাকা আরো অসংখ্য শ্রমিক অসুস্থতা বোধ করছেন। এর মধ্যে গুরুতর অসুস্থ শ্রমিকরা হলেন- প্লাটিনাম জুট মিলের হিরন ও খায়ের এবং স্টার জুটমিলের বাবুল ও ক্রিসেন্ট জুটমিলের সুলতান।
বকেয়া মজুরি পরিশোধ, মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ১১ দফা দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করছেন তাঁরা। এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ।

এর আগে গত রোববার খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা ওই আমরণ অনশন কর্মসূচি সফল করতে শপথ নিয়েছিলেন। নিজ নিজ মিল গেটে অনুষ্ঠিত সভা থেকে শ্রমিকরা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ওই কর্মসূচি সফল করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। সেসময় খুলনা শিল্পাঞ্চলের পাটকলগুলোর গেটে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম-আহŸায়ক মো. মুরাদ হোসেন বলেন, সোমবার রাত থেকেই অনশনের জন্য প্যান্ডেল প্রস্তুতির কাজ শুরু হয়। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে প্যান্ডেলের ভেতরে শ্রমিকরা আসতে শুরু করে। কানাই কানাই পূর্ণ হয়। শ্রমিকরা অনেকেই প্যান্ডেলের ভিতরে থাকতে পারছেন না। কাঁথা বালিশ নিয়ে তারা এখানে রাত-যাপন করবেন। দিন-রাত শ্রমিকরা অনশনে থাকবেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

মহানগরীর খালিশপুরে অবস্থিত চারটি পাটকল। দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিকরা অবস্থান নেন মিলের সামনের বিআইডিসি সড়কে। প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে কাপড় টানিয়ে প্যান্ডেল তৈরি করে অনশনে বসেছেন। বাকী সড়কও শ্রমিকরা আটকে রেখেছে। এরপরই রয়েছে প্লাটিনাম জুট মিল। ওই জুট মিলের শ্রমিকরা পুরো সড়ক জুড়েই অনশনের স্থল তৈরি করেন। ফলে সড়কটি বন্ধ হয়ে গেছে। চলাচল করতে পারছে না কোন যানবাহন। এছাড়া ওই এলাকায় থাকা খালিশপুর ও দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিকরা অবস্থান নিয়েছেন নিজ নিজ মিল গেটে। গত সোমবার দুপুর থেকেই কাঁথা-বালিশ নিয়ে শ্রমিকরা অনশনস্থালে আসতে শুরু করে। আশ্রয় নেন প্যান্ডেলের অভ্যন্তরে। রাতেও প্যান্ডেলের ভেতরেই থাকছেন। সেখানেই আদায় করেন নামাজ।
ক্রিসেন্ট জুট মিলের শ্রমিক আব্দুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের মূল দাবি মজুরি নিয়ে নয়। শ্রমিকরা মূলত: আন্দোলন করছেন মজুরি কমিশন বাস্তবায়ন, পাটকলে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রক্রিয়া বাতিল ও পাটখাতে পযাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার দাবিতে।

ওই দাবিগুলো আদায় হলেই তারা অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ওই পাটকলগুলো বিভিন্ন সমস্যা জর্জরিত থাকায় প্রভাব পড়ে শ্রমিকদের ওপর। মিলগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকা ও উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারার কারণে শ্রমিকদের মজুরিও ঠিক মতো পরিশোধ হয় না। এসব কারণে শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন।
সর্বশেষ নভেম্বরের শেষ দিক থেকে ১১ দফা দাবিতে নতুন করে আন্দোলন শুরু করেছেন শ্রমিকরা। ছয় দিনের কর্মসূচির সর্বশেষ কর্মসূচি হলো আমরণ অনশন করা। একই দাবি আদায়ে স্টার জুট মিলের প্রধান ফটকের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করেছে শ্রমিকরা।

খুলনা অঞ্চলে মোট রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল রয়েছে। খুলনায় থাকা পাটকলগুলো হলো ক্রিসেন্ট জুট মিল, খালিশপুর জুট মিল, দৌলতপুর জুট মিল, প্লাটিনাম জুট মিল, স্টার জুট মিল, আলিম জুট মিল, ইস্টার্ন জুট মিল, জুট মিল হলো-কার্পেটিং ও জেজেআই।

আটরা শিল্প এলাকার আলিম ও ইস্টার্ন জুট মিলের শ্রমিক কর্মচারীরা আমরণ গণ-অনশন কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসময় ইস্টার্ন জুট মিল সিবিএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. আকছার আলীর সভাপতিত্বে আলিম জুট মিলের মো. আমিরুল ইসলাম ও ইস্টার্ন জুট মিলের মো. সিরাজুল ইসলামের পরিচালনায় বক্তৃতা করেন আলমগীর হোসেন, আ. হক মহলদার, ইদ্রিস আলী প্রমুখ।

0Shares

Comment here