স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেশে প্রকাশ্যে ধূমপানের ওপর নানা ধরনের আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে।শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণপরিবহন, সরকারি অফিসসহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ।কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে জায়গায় মানুষ বাধ্য হয়ে একসঙ্গে বসবাস করে, সেই জেলখানায় ধূমপানের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর?অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে ধূমপান একটি সাধারণ এবং প্রায় অবাধ চর্চায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে যারা ধূমপান করেন না, তারা প্রতিনিয়ত পরোক্ষ ধূমপানের (Passive Smoking) শিকার হচ্ছেন।বাইরে যেমন কেউ ধূমপানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারেন, কারাগারের পরিবেশে সেই সুযোগ অনেকাংশেই সীমিত।সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপে সংখ্যালঘুর অধিকার কারাগারের ভেতরে ধূমপায়ীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অধূমপায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে অসহায় অবস্থায় পড়েন।তাদের অভিযোগ, একই কক্ষে বা ওয়ার্ডে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে থাকতে বাধ্য হওয়ায় শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা এবং নানা ধরনের শারীরিক অস্বস্তির সৃষ্টি হয়।মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কারাগারে থাকা একজন বন্দি তার মৌলিক স্বাস্থ্যগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না।শাস্তি ভোগ করলেও একজন মানুষ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ পাওয়ার অধিকার রাখেন।পরোক্ষ ধূমপান: নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি" চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপানও সমানভাবে ক্ষতিকর।একজন ধূমপায়ীর সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়া আশপাশের মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।কারাগারের মতো বদ্ধ পরিবেশে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।সেখানে বাতাস চলাচল সীমিত হওয়ায় ধোঁয়া দীর্ঘ সময় ধরে পরিবেশে থেকে যায় এবং অধূমপায়ীদের জন্য পরিস্থিতি আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।আইন আছে, বাস্তবায়ন কোথায়?দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও কারাগারের ভেতরে ধূমপান নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।সংশ্লিষ্টদের মতে, কারাগারে ধূমপান পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব করছেন—কারাগারের নির্দিষ্ট এলাকাকে "স্মোকিং জোন" হিসেবে নির্ধারণ করা।আবাসিক ওয়ার্ড, হাসপাতাল ইউনিট ও সাধারণ বসবাসের স্থানে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।অধূমপায়ী বন্দিদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করা।কারা কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো।ধূমপানবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা।অন্যের কষ্টের বিনিময়ে ব্যক্তিগত আনন্দ কি গ্রহণযোগ্য? সামাজিকভাবে এমন একটি ধারণা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। যেমন উচ্চস্বরে হর্ন বাজিয়ে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা সামাজিকভাবে নিন্দনীয়, তেমনি অন্যের শারীরিক অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে প্রকাশ্যে ধূমপান করাও প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ।অধূমপায়ীদের দাবি, কারাগারে ধূমপানের কারণে যে কষ্ট তারা ভোগ করেন, তা অনেক সময় নীরব নিপীড়নের রূপ নেয়। কারণ সেখানে প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ধূমপায়ীদের চাপে তাদের মতামত গুরুত্ব পায় না।সময়ের দাবি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কারাগারও একটি পাবলিক প্রতিষ্ঠান। ফলে সেখানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। ধূমপায়ীদের অধিকার যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি অধূমপায়ীদের নিরাপদ পরিবেশে থাকার অধিকারও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কারাগারে নির্দিষ্ট স্মোকিং জোন চালু এবং সাধারণ ওয়ার্ডে ধূমপান নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হলে একদিকে ধূমপায়ীদের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অন্যদিকে অধূমপায়ীরা পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি ও মানসিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবেন।কারাগারের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানবিক সংকট নিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শাহবাজ জামান (নির্বাহী পরিচালক)
প্রমোট বাংলাদেশ (নিবন্ধন নং-১১৬৭)