সাংবাদিকতা পেশা মূলত সত্য অনুসন্ধান ও সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করার এক মহান দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—একজন সাংবাদিক আরেকজন সাংবাদিকের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছেন। প্রশ্ন উঠছে, কেন এই দ্বন্দ্ব? আর এতে লাভ কার?বিশ্লেষকদের মতে, এই বিভাজনের পেছনে রয়েছে বিভিন্ন কারণ। প্রথমত, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভক্তি সাংবাদিকদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে। ফলে একেকজন সাংবাদিক একেক পক্ষের হয়ে অবস্থান নিচ্ছেন, যা পেশাগত ঐক্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বও এই সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে। স্কুপ বা একচেটিয়া খবর প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় সহকর্মীর প্রতি সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব তৈরি হচ্ছে।এছাড়াও ব্যক্তিগত স্বার্থ, ক্ষমতার লড়াই এবং প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এই দ্বন্দ্বকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে, যেখানে সাংবাদিকরা একে অপরকে প্রকাশ্যে সমালোচনা বা আক্রমণ করছেন।এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এতে লাভ কার? বাস্তবে এই সংঘাতের মাধ্যমে লাভবান হয় সেইসব গোষ্ঠী, যারা সত্য প্রকাশে বাধা সৃষ্টি করতে চায়।সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন থাকলে সত্যের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।তবে এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাংবাদিকতার নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতার উপর। যখন জনগণ দেখে সাংবাদিকরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, তখন তারা পুরো পেশার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেন। ফলে সমাজে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।এভাবে চলতে থাকলে কি আমরা অস্তিত্ব সংকটে পড়ছি? অনেকেই মনে করেন, যদি এই বিভাজন দূর না করা যায়, তবে সাংবাদিকতা পেশার মূল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই প্রয়োজন পেশাগত নৈতিকতা পুনরুদ্ধার, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি এবং সত্যের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান।সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত লড়াইয়ের ক্ষেত্র নয়; এটি সমাজের জন্য একটি দায়িত্বশীল সেবা। এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ বিভাজন নয়, বরং সহযোগিতা ও সংহতির সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।
শাহবাজ খান (নির্বাহী পরিচালক)
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কেন্দ্র