বর্তমান সময়ে সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশার মতো সাংবাদিকতাও নানা আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ফলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমত দ্রুত গড়ে উঠছে। এর ইতিবাচক দিক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভ্রান্তি, অপপ্রচার ও অতি উৎসাহী প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও।বিশেষ করে কোনো একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড বা বিতর্কিত আচরণের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজ কিংবা কোনো সংগঠনের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এটি শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং সাংবাদিক সমাজের ঐক্য ও পেশাগত মর্যাদার জন্যও হুমকিস্বরূপ।বিশ্লেষকদের অভিমত, “ব্যক্তির অপরাধ ব্যক্তিরই”—এই নীতিকে উপেক্ষা করে যখন কেউ সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে পুরো পেশাজীবী সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেন, তখন তা নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। আইন ও সামাজিক ন্যায়বোধ অনুযায়ী যে ব্যক্তি অপরাধ করবে, শাস্তিও তাকেই ভোগ করতে হবে। একজনের ভুলের জন্য আরেকজনকে দায়ী করা সভ্য সমাজের ন্যায়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও একই শিক্ষা পাওয়া যায়। ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী কেয়ামতের ময়দানে কেউ কারও পাপের বোঝা বহন করবে না। পিতা পুত্রের কিংবা পুত্র পিতার দায় নেবে না। সেই আলোকে পার্থিব জীবনেও ব্যক্তি অপরাধের দায় অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক ও অযৌক্তিক বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।সামাজিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সাংবাদিক সমাজের অভ্যন্তরে অকারণ দ্বন্দ্ব, কাদা ছোড়াছুড়ি ও পারস্পরিক বিরোধ শেষ পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষকেই লাভবান করে। এতে প্রকৃত সমস্যা আড়ালে থেকে যায় এবং পেশার সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। ফলে সাংবাদিক সমাজের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযম ও গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা জরুরি হয়ে পড়েছে।এ প্রসঙ্গে অনেকেই উদাহরণ টেনে বলেন, কোনো সন্তান অপরাধ করলে যেমন আইনের চোখে মাকে শাস্তি দেওয়া হয় না, তেমনি পিতার অপরাধের জন্য পুত্রও দণ্ডিত হয় না। একইভাবে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের দায় কোনো সংগঠন বা সমগ্র পেশাজীবী সমাজ নিতে পারে না।অন্যদিকে, কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের স্বার্থে মিথ্যা প্রচারণা, বিভ্রান্তিকর তথ্য কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাময়িক সুবিধা বা আনন্দ লাভের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে, অন্যায়ের প্রতিফল একদিন না একদিন ফিরে আসে। সমাজবিজ্ঞানীরা একে “প্রতিক্রিয়ার অনিবার্যতা” হিসেবে উল্লেখ করেন।সচেতন মহলের মতে, সব বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আইন, ন্যায়বিচার এবং সর্বোপরি সৃষ্টিকর্তার বিচারের প্রতি আস্থা রাখা একটি সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা; এখানে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার চর্চাই হওয়া উচিত মূল আদর্শ।অতএব, ব্যক্তি অপরাধকে ব্যক্তি পর্যায়েই মূল্যায়ন করা, অপপ্রচার থেকে বিরত থাকা এবং পেশাগত ঐক্য অটুট রাখা এখন সময়ের দাবি। তাহলেই সাংবাদিকতা তার প্রকৃত মর্যাদা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে।
শাহবাজ জামান
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী