বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে মানুষের অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। কেউ একজনকে স্বৈরাচার বলে, কেউ দুর্নীতিবাজ বলে, কেউ ধর্ম ব্যবসায়ী বলে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, ডাক্তার, পরিবহন চালক—প্রায় সবাইকে নিয়ে মানুষের অভিযোগ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু নেতাদের দোষ দিলেই কি সমাজ বদলে যাবে? নাকি আমাদের নিজেদের মধ্যেও সমস্যা লুকিয়ে আছে?আজকের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি—একজন রিকশাচালক সামান্য বৃষ্টি হলেই ২০ টাকার ভাড়া ৫০ টাকা চান। সিএনজি বা অটোরিকশাচালক অফিস টাইম বা ছুটির দিনে দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করেন। দুধ বিক্রেতা দুধে পানি মিশিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা করেন। কিছু অসাধু ডাক্তার প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত টেস্ট দেন, অপ্রয়োজনীয় অপারেশন করেন, এমনকি গর্ভবতী মায়েদের ভয় দেখিয়ে সিজার করাতে বাধ্য করেন। আবার বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা মিটার কারসাজির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ফেলেন।অন্যদিকে রাজনীতিবিদদের নিয়েও মানুষের মধ্যে নানা অভিযোগ ও ক্ষোভ রয়েছে। কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, কেউ দুর্নীতিতে জড়ান, কেউ জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করেন। ফলে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে এবং মনে করে, “দেশে ভালো মানুষ আর নেই।”কিন্তু বাস্তবতা হলো—সমাজ শুধুমাত্র রাজনীতিবিদদের দ্বারা তৈরি হয় না। সমাজ গড়ে ওঠে প্রতিটি মানুষের আচরণ, সততা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে। যদি সাধারণ মানুষ নিজের জায়গা থেকে অসৎ আচরণ করেন, তাহলে কেবল নেতাদের দোষ দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ দুর্নীতি শুধু উপরের স্তরে নয়, ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।একটি জাতি তখনই উন্নত হয়, যখন মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে। অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের কাজের দিকে তাকানো জরুরি। একজন ব্যবসায়ী যদি সৎভাবে পণ্য বিক্রি করেন, একজন ডাক্তার যদি মানবিক হন, একজন চালক যদি ন্যায্য ভাড়া নেন, একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ ও দুর্নীতি থেকে দূরে থাকেন—তাহলেই সমাজ ধীরে ধীরে বদলাবে।বাংলাদেশের মানুষ খারাপ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, লোভ ও অসততার সংস্কৃতি সমাজকে দুর্বল করে ফেলেছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষা, আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত সততার চর্চা। শুধু সরকার বদলালে হবে না, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে, পরিবর্তন শুরু হতে পারে আজ থেকেই—আমার থেকে, আপনার থেকে, আমাদের সবার থেকে।
শাহবাজ খান (সম্পাদক)
দৈনিক দিগন্তর