খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করার সিদ্ধান্তে নগরীর সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে তাঁর সরাসরি জনসংযোগ, সাহসী অবস্থান এবং জনগণের সঙ্গে খোলামেলা মতবিনিময়ের কারণে তিনি স্বল্প সময়েই অনেকের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।গত শনিবার বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট শাখা থেকে জারি করা এক পরিপত্রে তাঁকে ২১ জুনের মধ্যে ঢাকায় রিপোর্ট করতে বলা হয়। তবে তাঁর এই বদলির খবর প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে—অপরাধ দমনে জনআস্থা গড়ে তোলার যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন, তার ধারাবাহিকতা কীভাবে বজায় থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন অনেকের মুখে।অপরাধপ্রবণ এলাকায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ খুলনা নগরীর লবণচরা থানার মহিরবাড়ি খালপাড় এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও সংঘবদ্ধ অপরাধের কারণে অনেক মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। থানায় অভিযোগ করতেও অনীহা দেখা যায়।এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সম্প্রতি ওই এলাকায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে একাধিক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে কেএমপি। সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ সরাসরি পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিজেদের উদ্বেগ ও হতাশার কথা তুলে ধরেন। অনেকে অভিযোগ করেন, তথ্য দিলেও তা গোপন থাকে না, ফলে অপরাধীদের প্রতিশোধের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।একটি বক্তব্য, যা ছুঁয়ে যায় মানুষের মন মতবিনিময় সভায় এক পর্যায়ে স্থানীয়দের অভিযোগের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, তথ্য ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, অপরাধ দমনে পুলিশের ভেতরের কোনো অনিয়মও ছাড় দেওয়া হবে না।তাঁর এই স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল অবস্থান উপস্থিত মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, ভয় ও অবিশ্বাসের পরিবেশে একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য অঙ্গীকার অনেকের কাছে নতুন আশার বার্তা হয়ে আসে।মাঠের পুলিশিংয়ে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাশিদুল ইসলাম খানের অন্যতম বড় শক্তি ছিল মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তিনি শুধু নির্দেশনা দিতেন না, বরং সরাসরি সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ফলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও কমতে শুরু করেছিল।নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত জনসচেতনতা মূলক কার্যক্রম ও মতবিনিময় সভাগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।অনেকেই মনে করেন, অপরাধ দমনে শুধু অভিযান নয়, জনগণের আস্থা অর্জনও সমান গুরুত্বপূর্ণ—আর সেই কাজটিই তিনি করার চেষ্টা করেছিলেন। বদলির খবরে হতাশা : তাঁর স্ট্যান্ড রিলিজের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা যখন জনগণের আস্থা অর্জন করতে শুরু করেন, তখন তাঁর বদলি হওয়া স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশায় কিছুটা ভাটা পড়ে।তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্যক্তি নয়—প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাশিদুল ইসলাম খানের শুরু করা জনমুখী উদ্যোগ ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি যদি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে, তাহলে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনআস্থা অর্জনের বার্তা :খুলনার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—সাধারণ মানুষ শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার দেখতে চায় না, তারা চায় এমন একটি পুলিশ ব্যবস্থা যেখানে তথ্যদাতা নিরাপদ থাকবে, অভিযোগ গুরুত্ব পাবে এবং জনগণের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক হবে বিশ্বাসভিত্তিক।মোহাম্মদ রাশিদুল ইসলাম খানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড সেই বার্তাই নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর বদলি প্রশাসনিক বাস্তবতা হলেও, জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের যে উদাহরণ তিনি রেখে গেলেন, তা খুলনার মানুষের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শাহবাজ খান
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী