গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, অপরাধ, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনদুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন সাংবাদিকরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, হয়রানি এবং মব সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে, ক্যামেরা ভাঙচুর করা হচ্ছে, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতা কোন পথে এগোচ্ছে?-মব সহিংসতার নতুন বাস্তবতা : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গুজবনির্ভর জনমত তৈরির কারণে বর্তমানে মব সহিংসতা একটি বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যাচাই-বাছাই ছাড়াই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। এই উত্তেজিত জনতার মুখোমুখি হচ্ছেন সাংবাদিকরা। তারা যখন তথ্য সংগ্রহ করতে যান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই জনতা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে।বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে, স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা উগ্র জনতা সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতেও সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। মাঠে কাজ করা সংবাদকর্মীরা বলছেন, এখন আর শুধু তথ্য সংগ্রহ করাই কঠিন নয়; নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।পেশাদার সাংবাদিকতার সংকট : একসময় সাংবাদিকতা ছিল জনস্বার্থ রক্ষার শক্তিশালী মাধ্যম।কিন্তু বর্তমানে ভুয়া তথ্য, অপসাংবাদিকতা এবং অনলাইন ভিত্তিক অযাচাইকৃত কনটেন্টের ভিড়ে পেশাদার সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের ওপরও।অন্যদিকে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কিংবা দুর্নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের হুমকি, হামলা এবং অযাচিত চাঁদাবাজির মামলার শিকার হতে হচ্ছে। অনেক গণমাধ্যমকর্মী আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় জনসমক্ষে আসছে না। এটি গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য অশনিসংকেত। নারী সাংবাদিকরা বিশেষভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।এতে অনেকেই মানসিক চাপে ভুগছেন এবং পেশা ছাড়ার কথাও ভাবছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা এবং দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের কর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা ও মানসিক সহায়তার বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। অন্যদিকে, সাংবাদিকদেরও পেশাগত নৈতিকতা, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।মনে রাখতে হবে সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সমাজকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।কিন্তু যখন সাংবাদিকরাই মব সহিংসতার শিকার হন, তখন শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজের তথ্যপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো। তাই সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় সত্য প্রকাশের পথ আরও সংকুচিত হবে, আর পেশাদার সাংবাদিকতা পড়বে গভীর সংকটে।
শাহবাজ খান (নির্বাহী পরিচালক)
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণমাধ্যম কেন্দ্র (ihrmc)