বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দুর্নীতি আজ শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ঘুষ, উপঢৌকন, তদবির, প্রভাব খাটানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহার যেন সমাজের নানা স্তরে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যখন কোনো দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে, তখন প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে সাংবাদিকরা। প্রশ্ন ওঠে—দোষ কি শুধু সাংবাদিকের? নাকি যারা ঘুষ দেয়, সুবিধা কেনে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সম্পর্ক তৈরি করে, তারাও সমানভাবে দায়ী?কেন ঘুষখোর কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীরা সাংবাদিকদের উপঢৌকন দেন?বিশ্লেষকরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা ব্যবসায়ী সাংবাদিককে উপহার, সম্মানী বা অনৈতিক সুবিধা দিতে চান নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো—দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয়।প্রশাসনিক অনিয়ম গোপন রাখার চেষ্টা।নিজেদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হওয়া ঠেকানো।প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।ভবিষ্যতে সুবিধা আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি করা।অর্থাৎ, যেখানে একজন গ্রহণকারী আছেন, সেখানে একজন প্রদানকারীও আছেন। ফলে নৈতিক ও আইনি বিচারে উভয় পক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।সমাজের আয়নায় দুর্নীতির বাস্তবতা একটু গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, দুর্নীতি শুধু সরকারি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়।সামান্য বৃষ্টি হলেই অনেক এলাকায় রিকশা বা অটোর ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যায়।দুধে পানি মিশিয়ে বিক্রি করা, ওজনে কম দেওয়া,ডাক্তার সাহেবরা (সবাই নন) অপ্রয়োজনে দেন একগাধা টেস্ট, নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো—এসবও এক ধরনের অসততা।অন্যদিকে চাকরি পেতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি পাওয়ার পর সেই অর্থ তুলে আনতেই শুরু হয় অনিয়মের দৌড়। ফলে ঘুষ একটি চক্রে পরিণত হয়—যেখানে দাতা ও গ্রহীতা উভয়েই অংশীদার।অনেক নাগরিকের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না, থানায় অভিযোগ গ্রহণে অনীহা দেখা যায়, কিংবা সেবা পেতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়। এমন বাস্তবতায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে সাংবাদিকরা অন্যতম হলেও, অনেক সময় তাদেরই লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ: বাস্তবতা কী?সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা, তবে এই পেশার আড়ালে কেউ যদি ব্যক্তিস্বার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন।তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কিছু ব্যক্তির অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো সাংবাদিক সমাজকে দোষারোপ করা যেমন অন্যায়, তেমনি কোনো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীর অপরাধ আড়াল করাও অন্যায়।যদি কেউ অর্থ গ্রহণ করে সংবাদ গোপন করেন, তিনি দোষী। আবার কেউ যদি সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে অর্থ বা উপঢৌকন দেন, তিনিও সমানভাবে দোষী।পরিবর্তন আসবে কীভাবে?বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন দিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক ও নৈতিক পরিবর্তনের। ১. ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া—উভয়ের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান শুধু ঘুষখোরকে নয়, ঘুষদাতাকেও সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। ২. জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা-সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।৩. স্বাধীন সাংবাদিকতা শক্তিশালী করা-যেসব সাংবাদিক সত্য প্রকাশে কাজ করছেন, তাদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।৪. নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ চর্চা পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে সততা ও নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে।৫. ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ-যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ কম হবে, সেখানে ঘুষের সুযোগও কমে যাবে।উপসংহার: পৃথিবীতে ফেরেশতা নয়, মানুষ বাস করে। তাই ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলকে নিয়মে পরিণত করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাংবাদিক, প্রশাসন, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ নাগরিক—সবারই ভূমিকা রয়েছে। শুধুমাত্র একজনকে দোষী বানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ ঘুষের টেবিলে একজন টাকা নেয়, আরেকজন টাকা দেয়।তাই পরিবর্তনের প্রথম শর্ত হলো—নিজের অবস্থান থেকে অসততাকে না বলা। ঘুষ খাওয়া বন্ধ করতে হবে, ঘুষ দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।সমাজের প্রতিটি স্তরে নীতি ও আদর্শের চর্চা বাড়াতে হবে।তবেই দুর্নীতির এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব হবে এবং গড়ে উঠবে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ।
শাহবাজ খান
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী